Special News Special Reports State

পুরী ছেড়ে দিঘা, দখল হয়ে যাওয়া দেখে জগতের প্রভু জগন্নাথের কপালে ভাঁজ

0
(0)

চন্দন বন্দ্যোপাধ্যায় : রাত পোহালেই রথ। যে প্রভু জগন্নাথের রথ এখন প্রায় শাসক দল তৃণমূলের দখলে চলে গেছে। রাজ্যে ক্ষমতা দখল, পাড়ায় পাড়ায় টোটো ইউনিয়নের দখল, পাড়ার চেনা মোড়ে পুরোনো বাড়ি ভেঙে তৃণমূলী প্রোমোটারের দখল, গ্রামে গ্রামে মেঠো রাস্তার পাশে জমি হাঙরদের জমি দখল, অজয় নদীর বালি দখল, বীরভূমের মহম্মদ বাজারের পাথর দখল, কয়লা খান্দান দখল, সরকারি শিক্ষকের চাকরি দখলের এরপর এইবার হল প্রভু জগন্নাথের বাড়ি বাড়ি প্রসাদ বিলি করে সেই রথ যাত্রা উৎসবকে দখল করে নেওয়া। সত্যিই এই দখলের রাজনীতিটি বেশ ভালই। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য শুধুই দখল করে যাওয়া চারিদিক জুড়ে। বেশ ভালই টানাটানির এই সংসারে রথের চাকা ঘোরার আগেই প্রভু জগন্নাথ কেমন যেনো আতান্তরে পড়ে গেছেন এই বছর। খুব চিন্তায় পড়ে গেছেন তিনি কী করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না।

পুরীর সেই চেনা রাস্তা ছেড়ে কী করে যে তিনি দিঘার সমুদ্রের ধারে এই বছর ঘুরতে বের হবেন এতদিন পর কে জানে। চিন্তায় আছেন বলরাম আর সুভদ্রাও। এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন কিন্তু মুখে কথা নেই কারুর। বলরাম আর সুভদ্রার আশা নিশ্চয়ই প্রভু জগন্নাথ একটা উপায় বের করবেন। সেই নতুন রথ টানের সংসারে সব কিছু সহ্য হবে তো তাঁর কে জানে! আবার এই বর্ষায় বদহজম না হয়।

সেই যে গল্প আছে পুরীর রথের টান হলেই ডানা মেলে উড়ে যায় আকাশে নীলকন্ঠ পাখি। যে গল্প শুনে আর আকাশে পাখির খোঁজ করেই বড়ো হয়ে যাওয়া আমার। যে নীলকন্ঠ পাখি পৌঁছে গেলে তবেই নাকি হুগলির ৬২৬ বছরের  সেই বিখ্যাত মহেশের রথের টান হয় প্রতি বছর। এই এতো বছর পর কি তাহলে নীলকন্ঠ পাখি একটা নতুন স্টপেজ দেবে এইবার এই বছর। খুব চিন্তায় আছি আমি নিজেও।

মহেশের রথের রশিতে টান পড়ে তখন যখন পুরীর রথের টান হয় ঠিক তারপরেই। যে টানের ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে রাধারাণীর গল্প, সেই গঙ্গা ধরে কাঠ ভেসে যাওয়া, সেই পুরীর পরেই যে রথ যাত্রা দেখতে ভীড় উপচে পড়ে এই পুরনো ঘিঞ্জি শহরে। এইবার কিন্তু সেই ৬২৬ বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, অতীত দিনের স্মৃতি ভুলে একটা নতুন রথ যাত্রার আয়োজন আর প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে। যার মূল উদ্যোক্তা মা মাটি আর মানুষের সরকার।

সেই তৃণমূলের ব্রিগেড। যে ব্রিগেড ভোটের বাক্সে আগুন ঝরায়, যে ব্রিগেড সমাবেশ হলে লোক ভরায় মাঠে, যে ব্রিগেড ডেউচা পাঁচামির লোকদের সরকারের বিরুদ্ধ পক্ষের লোকদের মন ভিজিয়ে বোঝায় তোমাদের ভাল হবে গো-জমি দিয়ে দাও, আবার সেই ব্রিগেড রথের চঞ্চল চাকাকে উল্টো পথে ঘুরিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বলে জয় জগন্নাথ।

বেশ ভালই মজা লাগছে আমার এই রথের টানের আগের দিন। সেই পুরীর রথকে টেক্কা দিতে নানা আয়োজন আর উৎসব চলছে রাজ্যে জুড়ে। দিঘার পথে এগিয়ে চলেছে জনতার ঢল। পুরীকে টেক্কা দিতে নানা ধরনের প্ল্যান আর ফিকির খোঁজার চেষ্টা করা আর কি। খাজা রাজনীতির মোড়কে প্রভু জগন্নাথকে মুড়ে দিয়ে জয় জগন্নাথ বলে সোনার ঝাঁটা হাতে ঝাঁট দেওয়ার চেষ্টা করা রাজ্যের প্রধানের, যিনি আমাদের সব সময় আগলে রাখেন। আর সেটা দেখে মনে মনে আকাশপথে উড়তে উড়তে থমকে দাঁড়িয়ে যাওয়া সেই আমার স্বপ্নের নীলকন্ঠ পাখির। যে পাখিকে চোখে দেখিনি আমি কোনোওদিন। তবু তো আজ এই রথের চঞ্চল রাজনীতিতে সেও কেমন করে যেন বিহ্বল হয়ে গেছে।

পাড়ার মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানে এখন একটাই কথা পুরীর রথের পর আর ৬২৬ বছরের  শ্রীরামপুরের মহেশের রথের কথা নয়। সেই ৩০০ বছরের গুপ্তি পাড়ার রথের আলোচনা নয়। সেই পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদলের রথ নয়, সেই চন্দননগরের সোনার রথ নয়। শুধুই দিঘার সমুদ্রের ধারে নতুন রথের কথা।

এই রথ যাত্রার আয়োজন আর তার ঢক্কানিনাদে প্রভু জগন্নাথ বেশ দুশ্চিন্তায় আছেন এই বছর নিজেই। কি যে করবেন তিনি ঠিক বুঝতে পারছেন না। এমন অবস্থা যে তাঁর কোনও দিন হয়নি। এই স্নানযাত্রার পর প্রভু জগন্নাথের জ্বর আসা। অঙ্গরাগের ১৫ দিন পর প্রভু জগন্নাথের মন্দিরের দরজা খুলে যাওয়া। আর দরজা খুলে প্রভু জগন্নাথের রথ যাত্রা উৎসবে বেরিয়ে পড়া। যে উৎসব নিয়ে সেই রথ যাত্রা ধুমধাম নানা আয়োজন এর লাইন লিখে ফেলা। সেই ‘পথ ভাবে আমি দেব, আর রথ ভাবে আমি। আর অন্তর্যামী যিনি, তিনি মিটি মিটি করে হাসেন’। সেই রথের লাইন শুনেই আমাদের সকলের বড় থেকে বুড়ো হয়ে যাওয়া। সেই মা মাটি আর মানুষের ভরসার তৃণমূলের ব্রিগেডের কাছে ‘তাঁর’ দখল হয়ে যাওয়া দেখে জগতের প্রভু জগন্নাথের কেমন চিন্তায় পড়ে যাওয়া।

বলতে পারেন সত্যিই অসাধারণ এই বছরের রথ যাত্রা আর তার ইতিহাস। যে রথের ইতিহাসে লেখা হবে এক নতুন গল্প। অনেকেই বোধহয় আর নীলকন্ঠ পাখির খোঁজ করবেন না এই রথের দিন আর কোনদিন। হারিয়ে যাবে নীলকন্ঠ পাখি, হারিয়ে যাবে রাধারাণী আর রুক্মিণী কুমার, সেই বৃষ্টি ভেজা রাস্তার ধারে ফুলের মালা বেচার গল্প আর রথের মেলায় আমার আপনার ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতি ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাবে। এখন শুধুই এক মা মাটি আর মানুষের গন্ধ মাখা ‘তৃণমূলী’ ব্রিগেডের হাতে বন্দি আমাদের হাত হীন প্রভু জগন্নাথ। যিনি এমন অবস্হা হতে পারে তাঁর কোনওদিন , সেটা বোধহয় তিনি স্বপ্নেও‌ ভাবেন নি।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

As you found this post useful...

Follow us on social media!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *