National

সীমাহীন দুর্দশা! অথচ পরিযায়ী শ্রমিকরা এবার সংবাদ শিরোনামে নেই

0
(0)

খবর লাইভ : গত বছর ২৪ মার্চের পর দেশের প্রায় সমস্ত সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেল দখল করে রেখেছিল বিহার সহ অন্যান্য রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকরা। কিন্তু এ বছর মিডিয়ার নজর সেদিকে নেই বললেই চলে। এর পিছনে অন্য কারণ রয়েছে। আচমকা লকডাউন ঘোষণার ফলে বিহার ও বেশ কয়েকটি রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকরা আলোর তলায় চলে আসে। দিল্লি, মুম্বই, ব্যাঙ্গালুরু, চণ্ডীগড়, সুরাত, আহমেদাবাদ বা অন্য জায়গায় আটকে পড়া শ্রমিকদের নিয়ে ও তাদের বাড়ি ফেরার কাহিনী নিয়ে পাতা ভরিয়েছে সাংবাদিকরা। মূলত বিহার, উত্তর প্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ ছিল সেই পরিযায়ী শ্রমিকদের গন্তব্য।

লকডাউনের পর প্রথম দুই মাসে অন্তত তিন মিলিয়ন মানুষ ফিরেছিল বিহারে। সড়ক ও রেলপথ হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়ায় শত শত মাইল তারা পায়ে হেঁটে নিজভূমে ফিরে গিয়েছিল। অনেকে পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ ত্যাগ করেছে। কেউ কেউ অনাহারে ও রোগে মারা গিয়েছে। যারা বিহারে শেষ পর্যন্ত ফিরতে পেয়েছিল তাদের অস্বাস্থ্যকর সরকারি স্কুল, পঞ্চায়েত ভবন ও সরকারি এলাকায় কোয়ারান্টাইন করে রাখা হয়। ৭-৮ জন শ্রমিককে একটা ছোট ঘরের মধ্যে দমবন্ধকর পরিস্থিতিতে থাকতে দেওয়া হয়েছিল এবং নিজের বাড়িতে যাওয়ার আগে নোংরা মাদুর বা চাদরের উপর তারা রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছে। মজার ব্যাপার হল, এই শ্রমিকদের বেশিরভাগেরই করোনা হয়নি বা করোনায় মৃত্যু হয়নি। অন্য কারণে তাদের অনেকে মারা গিয়েছিল। অনেকে আবার সাপের কামড়ে প্রাণ হারিয়েছে। খাবার ও পানীয় জলের ব্যবস্থা ছিল ভয়াবহ। পুলিশের নির্মম লাঠি দিয়ে প্রতিবাদকে নীরব করে দেওয়া হয়েছিল।

বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নিতীশ কুমার প্রায় ১০০ দিন বাড়ির বাইরে বের হননি। রাজ্যের সমস্ত দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল আমলা ও পুলিশের হাতে। অনেকে মজা করে বলেছিল, বিহারের সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল গুপ্তেশ্বর পান্ডে। এর পর বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যার ঘটনা সামনে আসে এবং সমস্ত মিডিয়া সেই খবর নিয়ে মেতে ওঠে। গুপ্তেশ্বর পান্ডে নিজের পদ ছেড়ে দিয়ে জনতা দল ইউনাইটেডে যোগ দেন বিধানসভা নির্বাচনে লড়ার জন্য। কিন্তু জেডিইয়ের মিত্রদল বিজেপির সৌজন্যে তাঁর স্বপ্ন ভেস্তে যায়। বক্সার আসন থেকে বিজেপি অন্য প্রার্থী দেয়।

সে সব দিন এখন পুরোপুরি স্মৃতিতে চলে যাওয়ার আগেই আবারও ভিড়ে ঠাসা ট্রেনে হাজার হাজার মানুষ বাড়ি ফিরছে। কিন্তু মিডিয়া এবার তাদের বিষয়ে উদাসীন। গত বছর হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিকদের খাইয়েছিল নানা এনজিও, সমাজকর্মী ও দিল্লি, মুম্বই, জয়পুর, চণ্ডীগড় প্রভৃতি শহরের নানা ধর্মীয় সংগঠন। এ বছর এ দিকে কারও দৃষ্টি নেই বললেই চলে। এটা সত্যি যে, গত বারের মতো এত ভয়াবহ নয় এবারের সমস্যা, কারণ ট্রেন ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল করছে। এবং ঘরফেরতা পরিযায়ী শ্রমিকদের সংখ্যাও গতবারের চেয়ে তুলনায় কম। কিন্তু সেটাই একমাত্র কারণ নয়। চলতি বছরে ভারতের প্রায় ডজন খানের রাজ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শুধু সংকটজনক নয়, ভেঙে পড়বার মুখে। মহারাষ্ট্র, গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, পাঞ্জাব প্রভৃতি রাজ্যে অসংখ্য মানুষ করোনায় প্রাণ হারাচ্ছে রোজ। যদিও দিল্লির কেজরিওয়াল সরকার প্রাথমিকভাবে পরিযায়ী শ্রমিকদের না যেতে অনুরোধ করেছিল, কিন্তু অক্সিজেনের সংকট, বিপুল সংক্রমণ ও করোনাজনিত মৃত্যুর ফলে তাঁর সরকার অন্য দিকে নজর ঘোরাতে বাধ্য হয়েছে।

গত বছরের মতো, ২০২১ সালে দেশের সবচেয়ে কম করোনা সংক্রমিত রাজ্যগুলির মধ্যে রয়েছে বিহার। উদাহরণ হিসাবে বলা যেতে পারে, চলতি বছরের ২৩ এপ্রিলে বিহারের সরকারি রিপোর্ট মোতাবেক করোনা রোগীর সংখ্যা ১২৬৭২ জন এবং মারা গিয়েছে ৫৪ জন। ২৪ এপ্রিল রোগীর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১২৩৫৯ জনে এবং মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৭ জনে। ঠিক এই তারিখে গত বছর এই সংখ্যাটা আরও কম ছিল। সেদিন করোনা আক্রান্তদের সংখ্যার দিকে কারও নজর ছিল না, নজর ছিল হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রাণান্তকর গৃহে প্রত্যাবর্তনের দিকে। বিস্ময়ের ব্যাপার, বিহারে প্রথম অক্সিজেন-সম্পর্কিত প্রথম মৃত্যুটি হয় ২৪ এপ্রিল। তাও পাটনার দুই হোলসেল ওষুধ ব্যবসায়ীর মধ্যে ঝামেলা বাঁধায় এই সংকট দেখা দেয়। এই রাজ্যের সেরা স্বাস্থ্যকেন্দ্র পাটনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল চত্বরের মধ্যে এই ব্যবসায়ী অন্যজনকে গুলি করে। কিন্তু সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলগুলি এ বছর পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে চিন্তিত নয়, এ কথা অনস্বীকার্য।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

As you found this post useful...

Follow us on social media!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *