চন্দন বন্দ্যোপাধ্যায় : পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের পাদদেশে, সীমান্ত ঘেঁষা এক প্রত্যন্ত গ্রাম জিলিং সেরেং। শহর থেকে অনেক দূরে, রাস্তাঘাট নেই, নেই ইন্টারনেট কিংবা বিদ্যুৎ। আধুনিকতার ছোঁওয়া পায়নি সেই গ্রামে। তবু সেখান থেকেই উঠে এসেছে এক সাহসিনী মালতী মুর্মু। যিনি প্রমাণ করেছেন শিক্ষা দিতে হলে বিল্ডিং বা দালান নয়, দরকার শুধু মন-দায়বোধ আর সংকল্প।
২০২০ সালের লকডাউনে যখন গোটা দেশ থেমে গিয়েছিল, স্কুলের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, শিশুরা বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল, তখন মালতী মাত্র দুই মাসের সন্তানকে কোলে নিয়ে নিজের মাটির ঘরেই খুলে ফেলেন একটি ছোট্ট পাঠশালা। বিনামূল্যে পড়াতে শুরু করেন গ্রামের শিশুদের। প্রথমে কয়েকজন, তারপর সেই সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০-এর বেশি।
গ্রামের শিশুরা আগে স্কুলে যেতে পারত না, কারণ সবচেয়ে কাছের স্কুল ছিল বহু কিলোমিটার দূরে, পাহাড় ডিঙিয়ে পৌঁছতে হত। সেই দূরত্বই ঘুচিয়ে দেন মালতী। নিজের ঘর, নিজের সময়, নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেন শিক্ষার জন্য। প্রথমদিকে পরিবার, বিশেষ করে স্বামী আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু মালতীর অদম্য মনোবলের কাছে তিনিও পরে নতি স্বীকার করে পাশে দাঁড়ান।
আজ মালতী শুধুমাত্র একজন শিক্ষিকা নন, তিনি হয়ে উঠেছেন পুরো গ্রামের আলোর পথপ্রদর্শক’। একাধারে মা, শিক্ষক এবং সমাজগড়ার কারিগর। আদিবাসী কন্যা মালতী মুর্মু দেখিয়েছেন, শুধু সাহসে ভর করেই গড়ে তোলা যায় এক নতুন সকাল।
এই কথা আরও জরুরি হয়ে ওঠে যখন দেশের নানা প্রান্তে শিক্ষা দুর্নীতি, নিয়োগ কেলেঙ্কারি, ধর্ষণ, হিংসা আর শিশু মৃত্যুর খবর আমাদের ঘিরে ধরে। একের পর এক স্কুলে ঝুলছে তালা, যুবক-যুবতীরা বছরের পর বছর চাকরির জন্য পথে বসে। আর শিক্ষা যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে এক বিলাসিতা।
এই ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্যেই মালতীর কাহিনি যেন এক আশার প্রদীপ। তাঁর টিনের চালের স্কুলঘরে, একটি কালো বোর্ডে চক দিয়ে লেখা বাংলায় শিশুদের চোখে আজ ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। মালতী বলেছেন, আমি কিছু চাই না। শুধু চাই, এই গ্রামের কোনও শিশু যেন অন্ধকারে না হারিয়ে যায়।
এই একটি বাক্য যেন আমাদের সবাইকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। আমরা কী শিখছি? কী দিচ্ছি এই সমাজকে? মালতীর মতো মানুষরাই প্রমাণ করে দেন, আলো জ্বালাতে বিদ্যুৎ লাগে না। লাগে হৃদয়, দায়বদ্ধতা আর সাহস। যে ঘরে বিদ্যুৎ নেই, সেই ঘরেই জ্বলে ওঠে শিক্ষার আলো। অযোধ্যার কোলে দাঁড়িয়ে এক মা হয়ে উঠেছেন একটা গোটা প্রজন্মের ভবিষ্যতের রূপকার।




