চন্দন বন্দ্যোপাধ্যায় : লুচির বদলে পাঁপড়, সাবানের বদলে ছাইমাটি। কী নিশ্চয়ই ভাবছেন, হঠাৎ এমন কেন বলছি ? আরে, একটু তো সবুর করুন । বিষয়টা বরং খুলেই বলি।আজকাল সামাজিক বিচ্যুতি এমনই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধকেও অনেকেই ‘সাধারণ ভুল’, ‘ছোট ঘটনা’ হিসেবে দেখছেন। যেন ভাতের প্লেটে এক চামচ ডাল বেশি পড়ে যাওয়া! সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, তারই ফাঁকে চাপা পড়ে যাচ্ছে মেয়েটির সম্মান, তার আতঙ্ক, তার ভেঙে যাওয়া জীবন।
আমার সঙ্গে আপনি একমত নাও হতে পারে না। তবে আরজি কর, কসবা, বারাসাত- একের পর এক ঘটনা দেখার পর এই প্রশ্ন কিন্তু আমার মনে জাগছে। সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে, ধর্ষণ আর বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। বরং এক নতুন সমাজচিত্র, এক ‘ট্রেন্ড’। রাজ্যে কোথাও কোনও ঘটনা ঘটলেই তা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দিব্যি উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রথমে লোক দেখানো গা-ঝাড়া ভাব। দিন পেরিয়ে সপ্তাহ, সপ্তাহ পেরিয়ে মাস গড়ালেই প্রশাসন নিশ্চুপ, পুলিশ প্রায় অদৃশ্য । তখন ফাইল পড়ে থাকে টেবিলের কোণে, তদন্ত হয় ফেসবুকে, প্রতিবাদ উঠে আসে ইনস্টাগ্রামের স্টোরিতে। আর বাস্তবে? হয়তো একটা এফআইআর, সেটুকুই।
আর অভয়া? আরজি কর হাসপাতালের সামনে তার ভাস্কর্যটা আজও দাঁড়িয়ে নীরব সাক্ষী হয়ে। তাকে কেউ মনে রাখুক আর না রাখুক, হাসপাতাল রেখেছে। কেন জানেন? ওটা নির্বাক, নির্জীব।
নেতারা বলছেন, ‘আমরা শিক্ষা নিয়েছি।’ কিন্তু সেই শিক্ষা কি নীতি-নৈতিকতার? নাকি শুধুই প্রকল্প আর ফ্রেমের মধ্যে সীমাবদ্ধ? ‘রূপশ্রী’, ‘কন্যাশ্রী’-র মতো প্রকল্প থাকলেও, মেয়েদের নিরাপত্তা কোথায়? কলেজে ঢোকার মুখে এখন প্রশ্ন শুনতে হয়, ‘তোমার প্রকল্পের নাম কী?’ আর স্কুলের দরজায় তালা, যেটার আবার চাবি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!
ধর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বদলে চলছে মেকি প্রতিক্রিয়া। কিছু ঘটলে ছবি তোলা হয়, স্লোগান ওঠে, চায়ের কাপ হাতে আলোচনায় ব্যস্ত নেতারা পাশে থাকার বার্তা দেন। কিন্তু পাশে থাকা কি শুধুই ক্যামেরার ফ্রেমে? একবার এটা ভেবে দেখেছেন?
নারীর সম্মান যেন এখন রাজনৈতিক বিতর্কের ইস্যু। এখানে ‘না’ মানে ‘হ্যাঁ’, ‘বিচার’ মানে আপোষ। একটু মনে করে দেখুন, সব ক্ষেত্রেই মেয়েটির ওপর ঘটে যাওয়া অপরাধ চাপা পড়ে তার চরিত্র বিশ্লেষণের নিচে। কোথাও বলা হয় ‘অবৈধ সম্পর্ক’, কোথাও উঠে আসে ‘ব্যক্তিগত বিষয়’। ভাবটা এমন, ঠাকুর ঘরে কে আমি তো কলা খাইনি!
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল শিবরাম চক্রবর্তীর কৌতুকমাখা তির্যক মন্তব্য, ‘বিচারের দিন নয়, ভোটের দিনেই সব ফয়সালা হয়।’
ততদিন? আপনারা বরং লুচির সঙ্গে পাঁপড় খান। প্রকল্পে নাম তুলুন। মনে রাখবেন, ধর্ষণ যদি হয়েও যায়, আপনি কিন্তু ‘সরকারি প্যাকেজে’ আছেন!




