National

বোবদের সময়কাল : মানুষের জীবন-স্বাধীনতার মামলার শুনতে অনীহা ছিল তাঁর সময়কালে!

0
(0)

খবর লাইভ ‌: ১৭ মাসের মেয়াদ সম্পূর্ণ করে চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি পদ থেকে অবসর নিলেন এস এ বোবদে। প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের পর তিনি যখন ওই আসনে বসলেন তখন দেশের সুপ্রিম কোর্টের ভাবমূর্তি তলানিতে। গত কয়েক বছর ধরেই এই অবনমনের পালা চলছিল। বিচারপতি গগৈয়ের সময়কাল বিতর্কে পরিপূর্ণ। তাঁর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণকারী ৩৭০ ধারা বাতিল হয় তাঁর সময়েই। যে মামলায় সবচেয়ে বেশি তিনি মনোযোগ দিয়েছিলেন সেটি হল অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলা।

সুপ্রিম কোর্টের যখন বেসামাল দশা তখন সবাই আশা করেছিল যে বোবদে হয়ত সুপ্রিম কোর্টের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করবেন। যদিও বোবদের তেমন বিতর্কে জড়াননি, তবে নিজের মতো করে কিছু বিতর্ক তৈরি করেছিলেন তিনি। গত বছরের লকডাউনের সময় পরিযায়ী শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া নিয়ে একটি জনস্বার্থ দায়ের হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। দুর্ভাগ্যবশত, বোবদের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ পরিযায়ী শ্রমিকদের সুরাহা করতে যথাযথ রায় দিতে পারেনি। এই বেঞ্চ রায় দেয়, তারা লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকদের মজুরি দিতে সরকারকে চাপ দিতে পারে না। বিতর্কিত মন্তব্য করে বসেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, যদি তাদের খাবার দেওয়া হয়, তাহলে তাদের টাকার প্রয়োজন হবে কেন?

এই বক্তব্যের মধ্যে সহানুভূতির অভাব রয়েছে। সেই সঙ্গে সংবিধানের ২১ ধারার যে স্পিরিট তা বিঘ্নিত হয়। এই ধারায় ‘জীবনের অধিকারের’ কথা বলা আছে। এই জীবনের অধিকারের অর্থ পশুর মতো বেঁচে থাকা নয়। বরং সম্মানের সঙ্গে বাঁচা। খাদ্য ও বাসস্থানের অধিকারকে সুনিশ্চিত করে এই ধারা। এরপর কয়েক জন বরিষ্ঠ আইনজীবী প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতিদের কাছে লিখিত জানান যে, হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে। শেষে সুপ্রিম কোর্টের অন্য একটি বেঞ্চ এই ব্যাপারে কিছু নির্দেশ দেয়।

প্রধান বিচারপতি একই রকম অমানবিক আচরণ করেন কেরলে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পানের মামলায়। এই মামলার সঙ্গে নাগরিক স্বাধীনতার মতো বিষয়টি জড়িয়ে থাকলেও ৪ সপ্তাহের জন্য স্থগিত করে রাখা হয় এবং শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি বলেন যে, আদালত ৩২ ধারার পিটিশনকে ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করছে। ঠিক এর বিপরীতটা ঘটে রিপাবলিক টিভির প্রধান সম্পাদক অর্ণব গোস্বামীর বেলায়। সেটাও ছিল ৩২ ধারার আওতাধীন। অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দায়ের হওয়ার একদিনের মধ্যে গোস্বামীর মামলার শুনানি হয় এবং গোস্বামীকে অন্তর্বর্তী জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, বোম্বে হাইকোর্টকে তীব্র সমালোচনা করা হয় এবং বলা হয় যে, ব্যাক্তির স্বাধীনতা যখন ঝুঁকির মুখে পড়ে তখন সাংবিধানিক আদালতের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে হস্তক্ষেপ করা।

কাপ্পানের বিষয়টি যখন প্রধান বিচারপতিকে জানানো হয়, তখন তিনি বলেন,”প্রতিটি মামলা আলাদা।” প্রধান বিচারপতি হয়ত ঠিকই বলেছেন। কাপ্পান তো আর অর্ণব গোস্বামী নন। গত বছর ৬ নভেম্বর সিজিআই বোবদে আদালত অবমাননার নোটিশ পাঠান মহারাষ্ট্র আইন পরিষদের সহকারি সেক্রেটারিকে এবং অর্ণব গোস্বামীর ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয় যে, কাউকে আদালতে হাজির হওয়া থেকে আটকানোর ক্ষমতা দেশের কোনও কর্তৃপক্ষের নেই। ৩২ ধারা তাহলে কেন রয়েছে? কিন্তু এই ধারাকে প্রয়োগের ক্ষেত্রে রকমফের রয়েছে। এদিকে, বি আর আম্বেদকর এই ধারাকে ‘সংবিধানের আত্মা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। সেই সঙ্গে মৌলিক অধিকার রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী এই ধারা। কিন্তু এটি সুবিধাভোগী শ্রেণির জন্যই এখন খোলা রয়েছে। বাকিদের জন্য ভিন্ন পথ।

সাধারণের ধারণা যে, মানুষের জীবন ও স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে এমন মামলার শুনানির ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট গড়িমসি করে না। কিন্তু ২০২০ সালের ১৮ ডিসেম্বর মাসে করা এক আরটিআই অনুযায়ী, এ বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১০৭২টি জামিন সংক্রান্ত মামলা ও ৫৮টি হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন স্থগিত হয়ে রয়েছে, শুনানি দিন গুনছে। সংবিধানের ৩৭০ ধারা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। আবার, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে ১৪০টি পিটিশন এখনও ঝুলে আছে।

২০১৮ সালের ইলেক্টোরাল বন্ডস প্রকল্পের শুনানি ক্ষমতাসীন দলকে সুবিধা করে দিয়েছে বলে অভিযোগ। এই বন্ডের মাধ্যমে নির্বাচনে টাকা ঢালে রাজনৈতিক দল। যাইহোক, এই সব কিছু মধ্যে প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের একটি টুইট সুপ্রিম কোর্টকে বিপাকে ফেলে এতটাই যে তাঁর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করতে হয়। কিন্তু এই মামলা শোনার জন্য কোনও বেঞ্চ গড়া হয়নি। কিছু মামলাকে কি সময়ের গহ্বরে ফেলে দিয়ে মুক্তি পেতে চায় শীর্ষ আদালত? এদিকে, সময়ের বালুরেখায় কোনও ছাপ না রেখেই আদালত থেকে বিদায় নিলেন বিচারপতি বোবদে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

As you found this post useful...

Follow us on social media!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *