খবর লাইভ : ‘রাজনৈতিক প্রভুদের’ খুশি রাখতে গিয়ে আরও একবার আদালতে মুখ পোড়াল কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই। সোমবার সকালে বাড়িতে কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে হানা দিয়ে নারদকাণ্ডে অভিযুক্ত রাজ্যের পঞ্চায়েত মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়, পরিবহণ মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র ও বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক ঘুচিয়ে দেওয়া কলকাতার প্রাক্তন মহানাগরিককে গ্রেফতার করেছিলেন সিবিআই আধিকারিকরা। সন্ধেবেলা ধৃত চার জনকেই ৫০ হাজার টাকার বন্ডে জামিন দিয়েছেন সিবিআইয়ের বিশেষ আদালতের বিচারক অনুপম মুখোপাধ্যায়।
দলের তিন মন্ত্রী-বিধায়ক অন্তর্বর্তী জামিন পাওয়ায় স্বস্তির হাওয়া তৃণমূল শিবিরে। নিম্ন আদালতে ধাক্কা খেয়েই এদিন রাতেই দিল্লির ‘প্রভুদের’ নির্দেশে চার নেতার জামিনের বিরোধিতা করে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির এজলাসে পৌঁছে গিয়েছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার আধিকারিক ও আইনজীবীরা।
২০১৪ সালে তৃণমূলের বাছাই করা নেতা-মন্ত্রীদের নারদ স্টিং অপারেশন শুরু করেছিলেন ম্যাথু স্যামুয়েল নামে এক সাংবাদিক। ২০১৬ সালে বিধানসভা ভোটের আগে সেই স্টিং অপারেশনের ভিডিয়ো ফুটেজ প্রকাশ্যে আনা হয়। শোরগোল পড়ে যায় রাজ্য রাজনীতিতে। সেই ভিডিয়ো ফুটেজে তৃণমূলের একাধিক নেতা- মন্ত্রী- সাংসদকে ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশধারী স্যামুয়েলের কাছ থেকে কাজের বিনিময়ে টাকা নিতে দেখা যায়। যদিও ওই ভিডিয়োতে তৃণমূলের হেভিওয়েট নেতা ফিরহাদ হাকিমকে টাকা নিতে দেখা যায়নি। নারদ স্টিং কাণ্ড নিয়ে হইচই বাঁধিয়ে ২০১৬ বিধানসভা ভোটের বৈতরণী পার করতে পারেনি বঙ্গ বিজেপি।
রাজ্যের শাসকদলের নেতা-মন্ত্রী সাংসদদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্তের দাবিতে মামলা গড়িয়েছিল দেশের শীর্ষ আদালতে। শেষ পর্যন্ত শীর্ষ আদালতের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব নেয় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই। কিন্তু কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তের কখনও শ্লথগতি আবার কখনও অতি সক্রিয়তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। একাধিকবার জেরা করা হয় তৃণমূলের হেভিওয়েট নেতা-মন্ত্রীদের। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা ভোটের ফলাফলে বিপুল জনাদেশ নিয়ে রাজ্যে তৃতীয়বার তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পরেই গত ৭ মে চুপিসাড়ে তৃণমূল কংগ্রেস নেতা ফিরহাদ হাকিম, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, মদন মিত্র ও শোভন চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট পেশের জন্য সিবিআইকে অনুমতি দেন রাজ্যপাল জগদীপ ধনকর।
সেই অনুমতি পাওয়ার পরে এবং দিল্লির রাজনৈতিক প্রভুদের বিশেষ নির্দেশে এদিন সকালে আচমকাই বাড়িতে হানা দিয়ে কার্যত টেনে-হিঁচড়ে রাজ্য রাজনীতির চার দাপুটে নেতাকে নিজাম প্যালেসে নিয়ে যান সিবিআইয়ের আধিকারিকরা। তার কয়েকঘণ্টা বাদে চার জনকেই আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার করা হয়। ফিরহাদ হাকিম, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, মদন মিত্র, শোভন চট্টোপাধ্যায়দের গ্রেফতারের খবরে শোরগোল পড়ে যায় রাজ্যে।
সতীর্থদের পাশে দাঁড়াতে নিজাম প্যালেসে ছুটে যান তৃণমূল সুপ্রিমো তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকেও গ্রেফতারের জন্য সিবিআই আধিকারিকদের চ্যালেঞ্জ জানান মমতা।
রাজ্য রাজনীতির চার হেভিওয়েট নেতার গ্রেফতারি নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-নেত্রীরা। শুধু তাই নয়, ফিরহাদ- সুব্রতর মতো জনপ্রিয় নেতাদের গ্রেফতারি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরি থেকে শুরু করে সিপিএমের নেতারাও। একই অপরাধে অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও বিজেপির দুই হেভিওয়েট বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী এবং মুকুল রায়কে কেন গ্রেফতার করা হল না, সেই প্রশ্নও তোলেন বিভিন্ন দলের নেতা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। এই দু’জনের মধ্যে শুভেন্দুকে টাকা নিতে দেখা গিয়েছিল নারদের ভিডিয়ো ফুটেজে। রাজ্য বিধানসভার তিন সদস্যকে গ্রেফতার করার আগে তাঁর অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে ক্ষোভ উগরে দেন বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তবে রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব সরাসরিই সিবিআইয়ের সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়ান। বিজেপি নেতা রাহুল সিনহার যুক্তি, ‘কাকে গ্রেফতার করা হবে আর কাকে করা হবে না, তা সম্পূর্ণই সিবিআইয়ের এক্তিয়ারভুক্ত।’
দুপুরে সিবিআইয়ের বিশেষ আদালতে রাজ্যের চার জনপ্রিয় নেতা-মন্ত্রীর গ্রেফতারি সংক্রান্ত মামলার শুনানি হয়। জনরোষের ভয়ে ধৃত চার নেতাকে অবশ্য সশরীরে আদালতে হাজির করার সাহস দেখাননি সিবিআইয়ের আধিকারিকরা। শুনানিতে ফিরহাদ- সুব্রত- মদনদের প্রভাবশালী নেতার তকমা দিয়ে ১৪ দিনের জেল হেফাজতে পাঠানোর আর্জি জানান সিবিআইয়ের আইনজীবী। সেই আর্জির বিরোধিতা করেন চার নেতার আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সহ অন্যান্যরা। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সংস্থার আইনজীবীর যুক্তিকে খারিজ করে দিয়ে ধৃত চার জনের অন্তর্বর্তী জামিন মঞ্জুর করেন বিচারক অনুপম মুখোপাধ্যায়। সকালে যে হাই ভোল্টেজ নাটকের সূচনা হয়েছিল, তার উপরে যবনিকাপাত ঘটল সন্ধেয়। দিন শেষে নিট ফল, অ্যাডভান্টেজ তৃণমূল আর মুখ পুড়ল কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার।




