খবর লাইভ : লঙ্কায় যে যায়, সেই হয় রাবণ। নরেন্দ্র মোদির জমানাও তার ব্যতিক্রম নয়। নারদ কাণ্ডের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। শুধুমাত্র বিজেপি বিরোধী হওয়ার কারণেই কি মহামারীর সময়েও গ্রেফতার করা হয়েছে চার অভিযুক্ত ফিরহাদ হাকিম- সুব্রত মুখোপাধ্যায়- মদন মিত্রদের? আবার গেরুয়া শিবির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার জন্যই শোভন চট্টোপাধ্যায়কে ফের ধরা হল? এই ধরনের নানা প্রশ্নে নাজেহাল বঙ্গ বিজেপির নেতারা। চারজনের মধ্যে বাকি তিনজনকে হাতেনাতে টাকা নিতে দেখা গেলেও কলকাতার প্রাক্তন মহানাগরিক ফিরহাদ হাকিমকে নারদের ভিডিয়ো ফুটেজে সরাসরি টাকা নিতে দেখা যায়নি। অথচ তাঁকেও জেলে পুরে দিয়েছেন সিবিআইয়ের আধিকারিকরা।
অথচ ভিডিয়োতে যাঁকে টাকা নিতে দেখা গিয়েছিল, সেই শুভেন্দু অধিকারী বহাল তবিয়তেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন বাইরে। সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ধর্মের বিষ ঢেলে চলেছেন প্রতিনিয়ত। টাকা নিতে দেখা যায় শঙ্কুদেব পাণ্ডাকেও। তিনি এবং মুকুল রায়দের মতো বিজেপির নেতারা এখনও বাইরে! কেন শুভেন্দু, মুকুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হল না, তার সপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন সিবিআইয়ের আধিকারিকরা। যদিও তাকে ছেঁদো যুক্তি বলে মনে করছে ঘাসফুল শিবির।
যে নারদ কাণ্ড নিয়ে ফের উত্তাল বঙ্গ রাজনীতি, একবার পিছনে ফিরে দেখা যাক কী ঘটেছিল?
সূত্রপাত
বিশ্বে কুখ্যাত ইজরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ এর আধিকারিক মাইক হারারিকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০১৪ সালে ‘বিতর্কিত’ ম্যাগাজিন ‘তেহেলকা’র ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজিং এডিটর ম্যাথু স্যামুয়েল নামে বহু এক সাংবাদিক বাংলায় তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে একটি স্টিং অপারেশন শুরু করেছিলেন। সঙ্গে নিয়েছিলেন অ্যাঞ্জেল আব্রাহামকে। ইমপেক্স কনসালটেন্সি সলিউশনস নামে এক ভুয়ো কোম্পানি তৈরি করে বাংলার ক্ষমতাসীন দল তৃণমূলের একাধিক শীর্ষ নেতা, সাংসদ ও মন্ত্রীর কাছে পৌঁছে গিয়ে ঘুষ দিয়ে কাজ পাওয়ার দরবার করেছিলেন। ওই মন্ত্রী-নেতারা হলেন ফিরহাদ হাকিম, মুকুল রায়, শুভেন্দু অধিকারী, সৌগত রায়, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, শোভন চট্টোপাধ্যায়, মদন মিত্র, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, সুলতান আমেদ (প্রয়াত), ইকবাল আমেদ, অপরূপা পোদ্দার, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, আইপিএস এসএমএইচ মির্জা, শঙ্কুদেব পণ্ডা।
কত ঘণ্টার ভিডিয়ো ফুটেজ ও কত টাকা ঢালা হয়েছিল?
তৃণমূলের শীর্ষ নেতা-মন্ত্রীদের ঘুষ দেওয়া ও তাঁদের সঙ্গে কথোপকথনের প্রায় ৫২ ঘণ্টার ফুটেজ ধারণ করা হয়েছিল নারদ স্টিং কাণ্ডে। প্রথমে গোটা অপারেশনের জন্য ২৫ লক্ষ টাকা বাজেট ধরা হয়েছিল। পরে সেই বাজেট বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ লক্ষ টাকা। ম্যাথু স্যামুয়েলের দাবি, ‘তৃণমূলের প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ তথা চিটফান্ড সংস্থা অ্যালকেমিস্টের কর্ণধার কেডি সিংয়ের নির্দেশেই শুরু হয়েছিল স্টিং অপারেশন এবং তিনিই পুরো টাকা দিয়েছিলেন।’
কবে প্রথম প্রকাশ্যে আসে নারদ ফুটেজ?
২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার কয়েকদিন বাদে ১৪ মার্চ নারদ ওয়েব পোর্টালে স্টিং অপারেশনের ভিডিয়ো ফুটেজ প্রকাশ করা হয়। রাজ্য বিজেপির দফতরে সাংবাদিক সম্মেলনে ওই ভিডিয়ো প্রকাশ করেন তৎকালীন বঙ্গ বিজেপির ভারপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক সিদ্ধার্থনাথ সিং। যা নিয়ে হইচই পড়ে যায় গোটা দেশে৷
সিবিআই তদন্ত চেয়ে জনস্বার্থ মামলা
বিধানসভা ভোটে নারদ স্টিং অপারেশনের ভিডিয়ো রাজনৈতিকভাবে তৃণমূলকে চাপে ফেললেও, বাংলাতে ফের সরকার গঠন করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকার। কলকাতা হাইকোর্টে সিবিআই তদন্ত চেয়ে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়। ২০১৭ সালের ১৭ মার্চ কলকাতা হাইকোর্ট সিবিআইকে প্রাথমিক তদন্ত শুরুর নির্দেশ দেয় এবং নারদ কাণ্ডে যাঁদের নাম উঠে এসেছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়েরেরও নির্দেশ দেয়। হাইকোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টের দরজায় কড়া নাড়া হয়েছিল। কিন্তু দেশের শীর্ষ আদালত সিবিআই তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
নারদ কাণ্ডে প্রথম ব্যবস্থা
কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশের পরেরদিন রাজ্যের তৃণমূল সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশ আধিকারিক এসএমএইচ মির্জার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
নারদ কাণ্ডে প্রথম এফআইআর
কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশের পরে ২০১৭ সালের ১৬ এপ্রিল তৃণমূলের ১২ জন সাংসদ-মন্ত্রী ও পুলিশ আধিকারিক এসএমএইচ মির্জার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে সিবিআই। এফআইআর নম্বর- আরসি/০১০২০৭এ০০১০। ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২০ বি, ১৩(২), ১৩ (১ডি) ও দুর্নীতি দমন আইনের ৭ নম্বর ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
নারদ কাণ্ডে প্রথম গ্রেফতার
২০১৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রথম গ্রেফতার করা হয় আইপিএস মির্জাকে। বেশ কয়েক মাস বাদে তিনি মুক্তি পান। গত ১৭ মে গ্রেফতার করা হয় রাজ্যের দুই হেভিওয়েট মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম ও সুব্রত মুখোপাধ্যায়কে। ওইদিনই গ্রেফতার করা হয় প্রাক্তন মন্ত্রী তথা তৃণমূল বিধায়ক মদন মিত্র ও প্রাক্তন মন্ত্রী তথা কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়কে।




