খবর লাইভ : সোমবার লোকসভাতে ১৫০ তম বার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ আলোচনায় বরাবরই গুরুত্ব পেয়েছে বন্দে মাতরম গানটি। এই গানটির ১৫০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান উপলক্ষে দিনভর ১০ ঘণ্টা ধরে চলা আলোচনায় উঠে এলো গানের ইতিহাস, সংবেদনশীলতা, এবং দেশীয় চেতনাকে কেন্দ্র করে নানা মত ও প্রতিক্রিয়া।
গানের ইতিহাস, মর্যাদা
বন্দে মাতরম মূলত ১৮৭০-এর দশকে লেখা হয়েছিল, এবং পরে ১৮৮২ সালে আনন্দমঠ উপন্যাসে গান হিসেবে প্রকাশ পায়।
• ১৯৫০ সালে, এটি ভারতের জাতীয় গান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
• আলোচনা শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, গানটি শুধু একটি স্লোগান নয় — এটি স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি, জাতিগত ঐক্য ও জাতীয় চেতনার প্রতীক।
বিতর্ক এবং ইতিহাস: ১৯৩৭-র সিদ্ধান্ত
কিন্তু গানটির ইতিহাস শুধুই গৌরবময় নয়। ১৯৩৭ সালে, ঐ সময়কার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস একটি সিদ্ধান্তে বন্দে মাতারামের কিছু স্তবক বাদ দিয়েছিল। গানের পরবর্তী স্তবকগুলোতে কিছু ধর্মীয় ইঙ্গিত (বিশেষত হিন্দু দেবী-দেবতা প্রসঙ্গ) ছিল, যা সব ধর্মের মানুষের জন্য গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে । তাই শতভাগ গানের পরিবর্তে শুধুমাত্র প্রথম দুটি স্তবককে জাতীয়ভাবে গাওয়া হতো। এই সিদ্ধান্ত গানের সার্বভৌম গ্রহণযোগ্যতার দিকে মনোযোগ রেখে নেওয়া হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকভাবে দাবি করা হয়।
এই সিদ্ধান্তের কারণে গানটি নিয়ে এরই মধ্যে বহুবার সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিতর্ক হয়।
সংসদীয় বিতর্ক: বিজেপি–কংগ্রেসের চাপানউতোর
এবার ১৫০ তম বার্ষিকীতে, গানটি নিয়ে সংসদে আলোচনা শুরুতেই রাজনৈতিক রূপ পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি দাবি করেছেন যে ১৯৩৭-র সিদ্ধান্ত, যা গানটির কিছু অংশ বাদ দিয়ে দেশকে বিভাজনের দিকে নিয়ে গেছে এবং তাঁর মতে এটা একটি ভুল ছিল যা ভারতের সাংস্কৃতিক ঐক্যকে ক্ষুণ্ন করেছে।
এদিকে বিরোধী দল (বিশেষ করে কংগ্রেস) এই অভিযোগকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে — ১৯৩৭-র সিদ্ধান্ত ছিল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে একটি সংবেদনশীল, বিবেচ্য পদক্ষেপ, যাতে গানের সার্বজনীন মর্যাদা বজায় রাখা যায়।
গানের গুরুত্ব আজও ঐতিহ্য, জাতীয় চেতনাবোধ ও সংহতি
বন্দে মাতরম শুধু একটি গান নয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক, একাত্মতার প্রতিশ্রুতি, এবং বাঙালি ও অন্যান্য ভারতীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের প্রতিফলন। ১৫০ বছর পর এই গানকে স্মরণ করার মাঝে রয়েছে অতীতের বলিদান, এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য সাংস্কৃতিক সংহতির বার্তা। সংসদে বহু নেতাই এই দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেছেন।
এই আলোচনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে — বন্দে মাতরাম কেবল পুরনো দিনের প্রতীক নয়, বরং আজও ভারতের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চেতনার একটি জীবন্ত প্রতীক। তার ইতিহাস, বিতর্কগুলো, এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট — সবকিছুই একসাথে মিলিয়ে গানটির গুরুত্ব আবার নতুন করে সক্রিয় হয়েছে।
কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা বললেন, ‘নরেন্দ্র মোদি যতদিন প্রধানমন্ত্রী রয়েছেন ততদিনই নেহরুকে ব্রিটিশ সরকার জেলবন্দি করে রেখেছিলেন। শুধু প্রিয়াঙ্কা নন, কংগ্রেসের গৌরব গগৈ, সমাজবাদী পার্টির প্রধান তথা উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদবও কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন প্রধানমন্ত্রীকে।
মোদির বক্তৃতায় উঠে আসে ক্ষুদিরাম বসু, রামপ্রসাদ বিসমিল, মদনলাল ধিংড়ার প্রসঙ্গ। বন্দে মাতরমের মাহাত্ম্যের কথা তুলে ধরতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও উদ্ধৃত করেন তিনি। বলেন, “গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “একই সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন, এক কার্যে সঁপিয়াছি সহস্র জীবন— বন্দে মাতরম।” প্রধানমন্ত্রী আরও একটি বাংলা পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করেন। বন্দে মাতরম কী ভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার তরুণদের উদ্দীপিত করেছিল সে কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তরুণ প্রজন্ম মৃত্যুকে ভয় না পেয়ে বন্দে মাতরম স্লোগান তুলত। বলত, “যায় যাবে জীবন চলে, জগৎমাঝে তোমার কাজে বন্দে মাতরম বলে।” ফাঁসির আগে বন্ধুকে লেখা চিঠিতেও সূর্য সেন বন্দে মাতরম মন্ত্র উল্লেখ করেছিলেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। সেই সঙ্গে তাঁর অভিযোগ, মুসলিম লিগের চাপে নেহরু জাতীয় গান হিসেবে ‘বন্দে মাতরম’-এর যে সংস্করণ গ্রহণ করেছিলেন, তা থেকে এর গুরুত্বপূর্ণ লাইনগুলি বাদ দেওয়া হয়েছিল।
পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় বাংলার প্রসঙ্গ তুলে ধরছেন বলে সোমবার লোকসভায় অভিযোগ করেন ওয়েনাড়ের কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কার। তিনি বলেন, আমরা কেন বন্দে মাতরম নিয়ে বিতর্ক করছি? কারণ শীঘ্রই বাংলার নির্বাচন আসছে। সরকার চায়, আমরা যেন অতীত নিয়েই মগ্ন থাকি, কারণ তারা বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চায় না। প্রিয়ঙ্কা বলেন, নেহরু ইসরো তৈরি না করলে মঙ্গলযান হত না। উনি এমস তৈরি না করলে সরকার কী ভাবে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করত? উনি ডিআরডিও তৈরি না করলে, আপনি তেজস পেতেন না। উনি আইআইটি নির্মাণ না করলে, তথ্য প্রযুক্তিতে আমরা পিছিয়েই থাকতাম।
জাতীয় গান বন্দে মাতরম নিয়ে প্রশ্ন তোলা সংবিধানের উপরে হামলা বলে দাবি করেন প্রিয়ঙ্কা। সংবিধানে বন্দে মাতরম্ বিতর্কে তাঁর বক্তব্য, ‘জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অপমান করা।




