খবর লাইভ : অযোধ্যা, ১৯৯২ সালের ছয়ই ডিসেম্বর। কয়েক লক্ষ হিন্দু ‘করসেবক’ সেদিন অযোধ্যায়। বেশ কয়েকজনকে দেখা গিয়েছিল বাবরি মসজিদের মাথায় উঠে পড়তে।
“লাল কৃষ্ণ আডবাণী সেই সময়ে বক্তৃতা করছিলেন, মনে আছে। বাবরি মসজিদের মাথায় তখন বেশ কয়েকজন করসেবক উঠে পড়লেন। মঞ্চের মাইক থেকে কয়েকবার বলা হয়েছিল যে মসজিদের গম্বুজে পতাকা তোলা হয়ে গেছে, এবারে নেমে আসুন আপনারা,” ছয়ই ডিসেম্বর অযোধ্যায় হাজির থাকা প্রবীণ সাংবাদিক শুভাশিস মৈত্র বলছিলেন।
আরও পড়ুনঃ কিছুক্ষণের মধ্যেই উদ্বোধন বহু ‘প্রতীক্ষিত’ রামমন্দিরের
তার কথায়, “সেই আবেদন তো কেউ শোনেই নি, উল্টে আরও বহু মানুষ উঠে পড়তে লাগল মসজিদের গম্বুজে। একটা সময়ে মি. আডবাণী মঞ্চ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, সেটাও মনে আছে। মুরলী মনোহর জোশীও মঞ্চে ছিলেন। তারপর তো সবাই জানেন যে কীভাবে মসজিদটি ভেঙ্গে পড়েছিল।”
মি. মৈত্র যে দুজন প্রবীণ বিজেপি নেতার কথা বলছিলেন, তারা ১৯৯২-র ছয়ই ডিসেম্বর অযোধ্যায় হাজির থাকলেও ২০২৪ সালের ২২শে জানুয়ারি যেদিন রামমন্দিরের উদ্বোধন হবে অযোধ্যায়, সেখানে হাজির থাকবেন না।
ওই অনুষ্ঠানে তাদের যোগ দিতে নিষেধ করেছে রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট।
তারাই রামমন্দির নির্মাণ আর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্বে আছে।
ট্রাস্টের প্রধান চম্পত রাই সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন যে লাল কৃষ্ণ আডবাণী আর মুরলী মনোহর জোশী দুজনকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, কিন্তু তারা যাতে সেদিন না আসেন, সেই অনুরোধও করেছেন মি. রাই নিজেই।
তার কথায়, “ওই অনুষ্ঠানে মি. আডবাণীর যোগ দেওয়া তো অবশ্যই উচিত, কিন্তু আমি অনুরোধ করব যে তিনি যেন না আসেন। আর মি. জোশীর সঙ্গে আমার সরাসরি কথা হয়েছে। তাকেও আসতে বারণ করেছি আমি। তিনি জেদ করছেন আসার জন্য। আমি বার বার তাকে বুঝিয়েছি যে আপনার অনেক বয়স হয়েছে, ঠাণ্ডার মরসুম এখন। তাছাড়া আপনার হাঁটুর অপারেশনও হয়েছে।”
রাম মন্দির আন্দোলনে যেমন বিজেপি ছিল, তেমনই ছিল উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ আর সরাসরি আরএসএসের শাখা সংগঠন বজরং দলও।
উত্তর প্রদেশের বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মুখপাত্র শরদ শর্মা বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “মি. আডবাণী আর মি. জোশীর মতো প্রাতঃস্মরণীয় নেতারা তো আমাদের সম্পদ। তাদের জন্য আর ‘শহীদ’ হওয়া করসেবকদের জন্যই তো আজ রাম মন্দির নির্মাণ সম্ভব হয়েছে। তাদের কী করে ভোলা যায়? তাদের দুজনকেই যথাযথ নিমন্ত্রণ করা হয়েছে।”
“আবার তাদের স্বাস্থ্যের দিকেও তো খেয়াল রাখা দরকার। তাদের বয়স, শীতকাল – এই সব মিলিয়েই মি. রাই অনুরোধ করেছেন যে মি. আডবাণী বা মি. জোশী যেন ২২ জানুয়ারি অযোধ্যায় না আসেন। তাদের সুস্থ থাকাটাও আমাদের কাছে জরুরি। ওরা যাতে সশরীরে হাজির না হলেও পুরো অনুষ্ঠান দেখতে পারেন, তার জন্য এলইডি স্ক্রিন ইত্যাদিরও ব্যবস্থা হচ্ছে”, বলছিলেন মি. শর্মা।
বিজেপির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম মি. আডবাণীর বয়স এখন ৯৬ বছর আর মুরলী মনোহর জোশী পরের বছর ৯০-তে পা দেবেন।
এঁরা দুজনে এবং তাদের সঙ্গে উমা ভারতী, সাধ্বী ঋতম্ভরা, কল্যাণ সিং, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা অশোক সিংঘল, প্রবীণ তোগারিয়া এবং বজরং দলের বিনয় কাটিয়ার – এই কয়েকটি মুখই ছিল আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে রাম মন্দির আন্দোলনের সবথেকে পরিচিত চেহারা।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দুই নেতা ছাড়া বাকিরা প্রত্যেকেই বিজেপির হয়ে কেউ মুখ্যমন্ত্রী, কেউ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, কেউ একাধিকবারের সংসদ সদস্য হয়েছেন।
লালকৃষ্ণ আডবাণী আশির দশকের শেষ দিকে রাম মন্দিরের পক্ষে জনসমর্থন জোটাতে গুজরাতের সোমনাথ থেকে সারা ভারত জুড়ে একটা রথযাত্রা করেছিলেন। সেই যাত্রা শেষ হয়েছিল অযোধ্যায় গিয়ে এক ‘করসেবা’র মধ্যে দিয়ে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, সেই প্রথম হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ভাবনা ভারতের একটা বৃহৎ অংশের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন মি আডবাণী-সহ বিজেপি নেতারা।
এরপরে ১৯৯২ সালেও করসেবার আয়োজন করে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো। সেই সময়েই ধ্বংস হয় বাবরি মসজিদ।
কলকাতার প্রবীণ সাংবাদিক শুভাশিস মৈত্রর কথায়, “লালকৃষ্ণ আডবাণীর রথযাত্রার সময়ে অনেক জায়গাতেই সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ হয়েছিল। আবার এটাও ঘটনা যে ছয়ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা প্রসঙ্গে তিনি নিজের আত্মজীবনীতে ওই দিনটিকে ‘জীবনের সবথেকে দুঃখের দিন’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।”




