খবর লাইভ : দলীয় নির্দেশকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শনিবার সংসদ ভবনে হাজির হয়ে উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিলেন কাঁথি ও তমলুকের সাংসদ শিশির ও দিব্যেন্দু অধিকারী । যদিও তাঁরা কাকে ভোট দিয়েছেন, কেনই বা দলের নির্দেশ অমান্য করলেন সে নিয়ে কোনও ব্যাখা দেননি অধিকারী পিতা-পুত্র। বরং দিল্লিতে তাঁদের উপস্থিতি নিয়ে প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছেন অথবা বিভ্রান্তিকর যুক্তি খাড়া করবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁরা যে আজ সংসদে হাজির হয়ে মতদানে অংশ নিয়েছেন তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে হাতেনাতে। সংসদ টিভির ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গিয়েছে, পার্লামেন্টের ৬৩ নম্বর কক্ষ থেকে ভোট দিয়ে বেরোচ্ছেন পিতা-পুত্র৷ এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসা মাত্র প্রবল শোরগোল পড়ে যায় কেন্দ্রীয় ও রাজ্য রাজনৈতিক মহলে। বলাই বাহুল্য, এ বিষয়ে যথেষ্ট বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ তৃণমূলের সংসদীয় শিবির।
আরও পড়ুনঃ সবচেয়ে ছোট বাণিজ্যিক রকেট উৎক্ষেপণ করল ইসরো
প্রসঙ্গত, শিশির-দিব্যেন্দুর দলীয় অবস্থান নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা অব্যাহত তৃণমূলের অভ্যন্তরে। এর আগে জুলাই মাসে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়েও দলীয় নির্দেশ অমান্য করেন অধিকারী পিতা-পুত্র৷ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশ ছিল দিল্লিতে নয়, দলীয় সাংসদ এবং বিধায়কেরা বিধানসভাতেই বিরোধী প্রার্থী যশবন্ত সিনহাকে দেবেন ভোট। মমতার সেই নির্দেশ কার্যত ব্যাকফুটে ঠেলে রাতারাতি দিল্লি উড়ে এসেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের তথাকথিত দুই সাংসদ শিশির ও তাঁর পুত্র দিব্যেন্দু অধিকারী। সংসদেই দিয়েছিলেন ভোট। শুধু তাই নয়, সে সময়েই উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এনডিএ প্রার্থী রূপে মনোনীত রাজ্যের প্রাক্তন রাজ্যপাল জগদীপ ধনকরের অকুণ্ঠ প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলেন শিশিরবাবু। বলেছিলেন, ‘ধনকর সেরা প্রশাসক। উপরাষ্ট্রপতি পদে যোগ্য প্রার্থী তিনি।’ দিব্যেন্দুও বলেছিলেন, ‘নিশ্চিতভাবে যিনি যোগ্য, তিনিই জয়লাভ করবেন। কিন্তু দলের কথাটাও মাথায় রাখতে হয়। নেত্রীর নির্দেশ মতো দিয়েছি ভোট।’ স্বাভাবিকভাবেই এই ‘ধোঁয়াশা’য় জড়াতে নারাজ ঘাসফুল শিবির। আগাম অশনি সংকেত আঁচ করে পদক্ষেপও নেয় তৃণমূল। শুক্রবার দলের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে শিশির-দিব্যেন্দুকে চিঠি পাঠিয়ে দলের লোকসভা দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। পত্রপ্রাপ্তির প্রসঙ্গে দিব্যেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, ‘আমরা এখন কলকাতায়। এনিয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নিইনি। তবে দল যদি কোনও নির্দেশ দিয়ে থাকে তা মেনে চলব।’ যদিও দলীয় নির্দেশ অমান্য করে শনিবার উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিয়ে শিশির-দিব্যেন্দু বুঝিয়ে দিলেন, তাঁরা আর যেখানেই থাক, তৃণমূলে যে নেই তা এদিন আবারও প্রমাণ হয়ে গেল। এই প্রসঙ্গে বহুবার শিশির-দিব্যেন্দুর সঙ্গে যোগাযোগ করার ব্যর্থ চেষ্টা চালানো হয়৷ শিশিরের আপ্ত সহায়ক জানান, এদিন সংসদ ভবনে উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মতদান জমা দেওয়ার পরেই কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন শিশির ও দিব্যেন্দু।
উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অধিকারী পিতা-পুত্রের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিয়ে ক্ষুব্ধ তৃণমূল শিবিরও। এ বিষয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘বিষয়টি জানতে পেরেছি। এনিয়ে যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার দলীয় শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি-ই নেবে।’ বর্ষীয়ান সাংসদ সৌগত রায়ের মতে, ‘তাঁদের কাছে (শিশির-দিব্যেন্দু) এটাই প্রত্যাশিত। তাঁরা কোন দলের প্রতি অনুগত, তা আবারও প্রমাণিত হল।’ রাজ্যসভার মুখ্য সচেতক সুখেন্দু শেখর রায় বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি বা উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ‘হুইপ’ জারি করা হয় না। সেদিক থেকে যে কেউ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে। কিন্তু দল যখন আনুষ্ঠানিকভাবে এই মতদান থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও তাঁরাও (শিশির-দিব্যেন্দু) যখন এখনও পর্যন্ত খাতায়-কলমে দলেরই সাংসদ, তখন সেই নির্দেশ মেনে চলা উচিত ছিল। এহেন দ্বিচারিতার কোনও স্থান নেই দলে।’ স্বাভাবিকভাবেই এই ইস্যুতে ভিন্ন মত পোষণ করেছে বিজেপি। রাজ্য বিজেপি সভাপতি তথা বালুরঘাটের সাংসদ সুকান্ত মজুমদার বলেন, ‘শিশির বা দিব্যেন্দু আমার সামনে ভোট দেননি৷ তাই তাঁরা কাকে ভোট দিয়েছেন আর কেনই বা ভোট দিয়েছেন সে নিয়ে মন্তব্য করা উচিত নয়। তবে এই নির্বাচন একট সাংবিধানিক পদে নির্বাচন। এতে কোনও হুইপ জারি করা হয় না। ফলে কে কাকে ভোট দেবেন, তা নিয়ে কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। শিশির-দিব্যেন্দু যদি ভোট দিয়েও থাকেন সেটা কোনও অপরাধ নয়৷ আমি মনে করি, তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদদেরও উচিত ছিল এই ভোটে অংশ নেওয়া ও বিশেষ করে জগদীপ ধনকরকে উদারহস্তে ভোট দেওয়া, কারণ তিনি বাংলার রাজ্যপাল ছিলেন। এই সব ক্ষেত্রে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করা উচিত।




