Arts & Culture Special News Special Reports State

শ্যামাসঙ্গীতের সুর আজও কালীপুজোর প্রাণ, নজরুল থেকে রামপ্রসাদ-বামাখ্যাপা-কমলাকান্ত বাঙালির হৃদয়ে

0
(0)

খবর লাইভ : কালীপুজোর রাতে এক স্নিগ্ধ মাধুর্য ছড়িয়ে দেয় শ্যামাসঙ্গীত। মাতৃভক্তির সুর, আবেগ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এই শ্যামাসঙ্গীত । রামপ্রসাদ সেন, বামাখ্যাপা, কমলাকান্ত ও নজরুল ইসলাম— এঁদের গাওয়া গান আজও কালীপূজোর মঞ্চে বাজানো হয়ে থাকে।

১৯ শতকের কলকাতার জমিদার বাড়িগুলোতে কালীপুজো চলত সমাজ‑উদারতার ও ঐতিহ্যের সঙ্গে। সেই সময় থেকেই ষোল আনি দিয়ে বা একান্ত পরিবারে শুরু হওয়া উৎসব এক ধাপে পাড়া-প্রতিপাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে। শ্যামাসঙ্গীত, সেই অমল সুরের মাধ্যমেই কর্ম, ভাব ও ভক্তিকে মিলিত করেছে।

দেবীর শক্তি ও ইতিহাস

মা কালীকে ‘দিগ্বর্মা’ রূপে আরাধনা করা হয়।মা অসীম শক্তির প্রতীক। রক্তবীজ নাশের সময়, বিজয় নৃত্যের পরে দেবীর মহিমা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। দেবীর এই রূপ ও উঁচু-নীচু অবস্থার রূপক থেকেই তৈরি হয়েছে পূজার ভাব ও সঙ্গীতের মিলন।

তারপরেও, এই পুজো শুধু দেবীপুজো নয়। এটা বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ভক্তির এক মিলনক্ষেত্র। আজকের কালীপুজোর আলো, ঝলমলে প্রেক্ষাপট, পরিবেশ‑সচেতন উদ্যোগ, সবই এক সঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছে।

শ্যামাসঙ্গীত: একটি জীবনধারা

মন রে কৃষিকাজ জানো না”— এই একক লাইনেই রামপ্রসাদ সেনের অসামান্য দূরদর্শিতা ফুটে ওঠে, যেখানে ভক্তি ও জীবনের অভিজ্ঞতা এক সঙ্গে মিলে যায়।
কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘শ্লোক ও গানের’ মধ্যে ঈশ্বরময় ভাব ও মানবতার এক সুরে মেলে ধরেছেন। “বল রে জবা বল, কোন সাধনায় পেলি শ্যামার চরণতল” — এই ধরনের ছন্দে শ্যামাসঙ্গীত কেবল মানসিক উচ্চারণ নয়, মানুষের আস্থা ও স্বরূপকে স্পর্শ করে।
শ্যামাসঙ্গীতের আরও প্রসিদ্ধ রূপ হলো কামালাকান্ত ভট্টাচার্যের রচিত “আমার সাধ না মিটিলো” — সেটি মানুষের অন্তর ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক ভূমিকা।

সমকালীন কালীপূজা ও চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে কালীপুজো রূপে দেখতে পাওয়া যায় আলো, প্রতিযোগিতা, নির্মাণ ও থিম। তবে সতর্ক হওয়ার বিষয় হলো, পুজোর মৌলিকতা হারিয়ে যাওয়া। এটি শুধুই আলো, বাজি ও নানান দৃষ্টিনন্দন আয়োজন নয়; মায়ের প্রতি ভক্তি ও শ্যামাসঙ্গীতের অনুভূতির গভীরতা আজও অপরিহার্য।
এছাড়া, পরিবেশ-সচেতন বাজি, সবুজ পুজো উপকরণ প্রভৃতি উদ্যোগ বাড়ছে। এই পরিবর্তন একটা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত, যাতে ধর্মীয় উপাদানের সঙ্গে সচেতনতা ও আধুনিকতা মিলেমিশে থাকে।

বাঙালির কালীপুজো হয় হৃদয় ও সঙ্গীতের মিলনক্ষেত্র। শতবর্ষের ইতিহাস, ভক্তি, সংস্কৃতি ও সংগীতে একসঙ্গে গাঁথা এই উৎসব।শ্যামাসঙ্গীতের ছোঁওয়া ছাড়া কালীপূজোর স্বাদ অপূর্ণই থেকে যায়।
যেখানে রামপ্রসাদ, কামালাকান্ত, নজরুলরা গেয়েছেন, সেই সুর আজও কালের বিভাজন অতিক্রম করে বাঙালির হৃদয়ে বাজে। কালীপুজোতে শুধুমাত্র আলো ও আয়োজনে নয়, অন্তরে পুর্নতা খুঁজে পায় সেই শ্যামাসঙ্গীতের মধুর স্পন্দন।

কলকাতার কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর, ঠনঠনিয়া, কাশীপুর, চিৎপুর— সর্বত্রই মায়ের নানা রূপে পূজা হয়। কালীঘাটের কালী মায়ের একান্ন পীঠের অন্যতম, যেখানে দেবীর আঙুল পড়েছিল। অন্যদিকে, রানি রাসমণির প্রতিষ্ঠা করা দক্ষিণেশ্বর ভবতারিণী মা।

হুগলির কামারপুকুর থেকে উঠে এসে দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরে মা ভবতারিণীর পূজারি হন গদাধর। সেখান থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন সাধক রামকৃষ্ণ পরমহংস। তাঁর “যত মত তত পথ” ভাবধারা হিন্দুধর্মে এনে দেয় এক নতুন দার্শনিক জাগরণ। স্ত্রী সারদা দেবীকে জগদম্বারূপে পুজো করে তিনি মানবতার ভক্তির এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেন।

কলকাতার পাথুরিয়াঘাটার বিখ্যাত কালীবাড়ি-র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীরা এই কালীবাড়িকেই করেছিলেন গোপন বৈঠকের স্থান। পুরুলিয়া, মেদিনীপুর, ঝালদা— সর্বত্র কালীপুজো শুধু ধর্মীয় নয়, হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার প্রতীক। কালী কলকাত্তাওয়ালি নামটি তাই আজও গর্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

মা কালী শক্তির প্রতীক, যিনি আমাদের শেখান বিনয়, সহিষ্ণুতা ও আত্মসমর্পণ। আর তাই আজও, যুগ বদলালেও বাঙালি গেয়ে ওঠে “শ্যামা মায়ের চরণতল, ও মন রে বল রে জবা বল।”

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

As you found this post useful...

Follow us on social media!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *