খবর লাইভ : আলিপুরদুয়ারে অনুষ্ঠিত ‘পরিবর্তন সঙ্কল্প সভা’য় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছেন। ৩২ মিনিটের ভাষণে তিনি রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে তীব্র সমালোচনা করেন এবং বিজেপি কর্মীদের নির্বাচনী মাঠে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান।
মোদি তাঁর ভাষণের ১৮ মিনিটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে ‘নির্মম’ শাসনের অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রের উপর মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে।” ভাষণের শেষে বিজেপি কর্মীদের নির্বাচনী প্রস্তুতির জন্য ‘কোমর বেঁধে’ নামার পরামর্শ দেন।
এছাড়া, ‘অপারেশন সিঁদুর’ প্রসঙ্গে ৮ মিনিট ব্যয় করেন মোদা। তিনি বলেন, “বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় এলে সিঁদুর অভিযান সফল হবে।” এটি তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপির নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিন আলিপুরদুয়ারে পাইপলাইনের মাধ্যমে রান্নার গ্যাস সরবরাহ প্রকল্পের শিলান্যাস করেন মোদি। এটি উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে কেন্দ্র সরকারের প্রতিশ্রুতির অংশ।
এদিকে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন যে তারা রাজ্যের ভোটার তালিকায় হরিয়ানা ও গুজরাটের ভুয়া ভোটার যুক্ত করছে। তিনি বলেন, “আমার কাছে প্রমাণ রয়েছে।” এই অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের সমর্থন নিয়ে করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
রাজনৈতিক মহলে এই সভাকে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতির সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই প্রধান রাজনৈতিক দলই তাদের অবস্থান শক্তিশালী করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পোশাকি নাম ছিল ‘পরিবর্তন সঙ্কল্প সভা’। ‘অপারেশন সিঁদুরে’র কথা উঠলেও আসলে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ডাক দেওয়াই যে সভার মূল উদ্দেশ্য, তা কর্মসূচির নাম প্রকাশ্যে আসতেই স্পষ্ট হয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে কোন প্রসঙ্গ কতটা জুড়ে থাকবে, তা রাজ্য বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছেও স্পষ্ট ছিল না। ফলে শুভেন্দু অধিকারী এবং সুকান্ত মজুমদারের সংক্ষিপ্ত ভাষণে ‘সিঁদুর’ প্রসঙ্গই প্রাধান্য পেল। কিন্তু তার পরে সভার মেজাজ বদলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং।
আলিপুরদুয়ারে বৃহস্পতিবার মোট ৩২ মিনিট ভাষণ দিয়েছেন মোদি। তার মধ্যে ১৮ মিনিট ব্যয় করেছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং শাসক তৃণমূলকে আক্রমণ করতে। ৮ মিনিট সময় নিয়েছেন ‘অপারেশন’ সিঁদুর’ প্রসঙ্গে। তাঁর ভাষণের বাকি ৬ মিনিট বরাদ্দ থেকেছে সম্ভাষণ-সহ আনুষঙ্গিক বিষয়ে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে বার বার ‘নির্মম সরকার’ বলে আক্রমণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। যা থেকে স্পষ্ট যে, পশ্চিমবঙ্গে এখন তাঁর নজর পরের বিধানসভা নির্বাচনের দিকে। বস্তুত, ভাষণের শেষে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি কর্মীদের কার্যত ভোটের ময়দানে নেমে পড়ার পরামর্শই দিয়ে গিয়েছেন মোদী। বলেছেন, ‘‘গণতন্ত্রের উপরে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি কর্মীদের আমি কোমর বেঁধে প্রস্তুত হতে বলছি।’’
বৃহস্পতিবার সকালে খারাপ আবহাওয়ার কারণে প্রধানমন্ত্রীর হেলিকপ্টার বাগডোগরা থেকে সিকিমের উদ্দেশে রওনা হতে পারেনি। বাগডোগরা থেকেই ভার্চুয়াল মাধ্যমে সিকিমের কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি। তার পরে আলিপুরদুয়ারে রওনা হয়ে হন। নির্ধারিত সময়ের ঘণ্টা দুয়েক আগেই প্রধানমন্ত্রী পৌঁছে গিয়েছিলেন আলিপুরদুয়ার প্যারেড গ্রাউন্ডে। ফলে তাঁর দুই কর্মসূচিই নির্ধারিত সময়ের বেশ কিছুটা আগে শুরু হয়। প্রথমে প্রশাসনিক মঞ্চ থেকে আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহার জেলার জন্য পাইপলাইনে রান্নার গ্যাস সরবরাহ প্রকল্পের শিলান্যাস করেন মোদী। তার পরে পৌঁছোন ‘পরিবর্তন সঙ্কল্প সভা’র মঞ্চে। রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু এবং রাজ্য বিজেপির সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত ভাষণ দেন মোদীর আগে। দু’জনেই সর্বাগ্রে ‘অপারেশন সিঁদুরে’র সাফল্যের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নামে জয়ধ্বনি দেন। তার পরে দু’জনেই তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোষণ তথা সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ তুলে সরব হন। কিন্তু স্থানীয় নেতাদের ছাপিয়ে যান মোদী।
প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ এই মহূর্তে নানা সঙ্কটের ঘেরাটোপে।’’ এমন পাঁচটি ‘সঙ্কটের’ কথা উল্লেখ করেন তিনি। মোদীর কথায়, ‘‘প্রথম সঙ্কট, সমাজে ছড়িয়ে পড়া হিংসা এবং অরাজকতা। দ্বিতীয় সঙ্কট, মা-বোনেদের নিরাপত্তার অভাব, তাঁদের উপরে অত্যাচার। তৃতীয় সঙ্কট, যুবকদের মধ্যে ঘোর নিরাশা, বেকারত্বের যন্ত্রণা। চতুর্থ সঙ্কট, ঘনঘোর দুর্নীতি এবং তার ফলে এখানকার প্রশাসনের উপরে জনতার বিশ্বাস একনাগাড়ে কমতে থাকা। পঞ্চম সঙ্কট, গরিবের অধিকার ছিনিয়ে নিতে থাকা ক্ষমতাসীন স্বার্থপর রাজনৈতিক দল।’’
মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের অশান্তির প্রসঙ্গ টেনে তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোষণের অভিযোগ তোলেন মোদী। তৃণমূলের বিধায়ক, কাউন্সিলর, স্থানীয় নেতারা ওই অশান্তিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে তোপ দাগেন। মোদীর কথায়, ‘‘মালদহ, মুর্শিদাবাদে যা হয়েছে, তা এখানকার শাসকদলের নির্মমতার দৃষ্টান্ত! আমি বাংলার জনতাকে জিজ্ঞাসা করতে চাই, এই ভাবে সরকার চলে? এই ভাবে সরকার চলবে?’’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘বাংলার মানুষের একমাত্র আশ্রয় এখন আদালত। সব বিষয়ে আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।’’ এর পরেই মোদি স্লোগান বেঁধে দেন— ‘বাংলার চিৎকার, লাগবে না নির্মম সরকার’।




