খবর লাইভ : পার্থ চট্টোপাধ্যায়ে বান্ধবী অর্পিতার বন্ধ ফ্ল্যাটের তালা খুলতে হিমসিম খাচ্ছেন ইডির আধিকারিকরা। কিন্তু শিক্ষকদের বদলির বন্ধ দরজা খোলার জন্য চাবি নিয়ে জেলায় জেলা তৈরি রয়েছেন এক শ্রেণির অসাধু স্বাস্থ্য আধিকারিক। সেই চাবির নাম মেডিকেল গ্রাউন্ড। মোটা টাকার বিনিময়ে চিকিৎসকদের কাছ থেকে পাওয়া আনফিট সার্টিফিকেট দিয়ে পছন্দের স্কুলের দরজা খুলে ঢুকে পড়ছেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা। অর্থাৎ বদলি কেলেঙ্কারির মৌচাক যদি হয় বিকাশ ভবন তবে তার মধুর ভাণ্ডারটি রয়েছে স্বাস্থ্য দপ্তরে। আর কেলেঙ্কারির প্রশ্নে দুই দপ্তরকে মিলিয়ে দিয়েছে বদলি সিন্ডিকেটের কারবারিরা।
আরও পড়ুনঃ ‘আত্মহত্যার চেষ্টা’ টলি অভিনেতার, নেপথ্যে পেশাগত হতাশা ?
শিক্ষা দপ্তর সূত্রে খবর, ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রাথমিক বা স্কুল সার্ভিস কমিশনে যত বদলি হয়েছে তার বেশিরভাগই হয়েছে মেডিকেল গ্রাউন্ডে। বদলির ক্ষেত্রে সাধারণত যেসব নিয়ম রয়েছে তার বেশিরভাগই মেডিকেল গ্রাউন্ডের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। স্কুলের ছাত্র-শিক্ষকের আনুপাতিক হার, শিক্ষক সংখ্যা, চাকরির পাঁচ বছর বয়স-এইসব কোনও শর্তেই মেডিকেল গ্রাউন্ডের বদলি আটকানো সম্ভব নয়। শিক্ষা দপ্তরের আধিকারিকদের একাংশ জানিয়েছেন, কোনও স্কুলে কোনও বিষয়ে একমাত্র শিক্ষকও যদি মেডিকেল গ্রাউন্ডে বদলির আবেদন করেন সেক্ষেত্রেও তাঁকে ছেড়ে দিতে বাধ্য সংশ্লিষ্ট স্কুলের প্রধান শিক্ষক। আর এই সুযোগের অপব্যবহার করছে বদলি সিন্ডিকেট।
স্ত্রীরোগ, হার্টের অসুখ, ক্যানসারের মতো কয়েকটি রোগের ক্ষেত্রে মেডিকেল গ্রাউন্ডে বদলির আবেদন করা যায়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, যাঁরা ওইসব রোগে ভুগছেন নিশ্চিতভাবেই তাঁদের চিকিৎসা বা অসুস্থতার কারণে মাঝেমধ্যেই ছুটি নেওয়ার ইতিহাস থাকবে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, জেলায় জেলায় এমন বহু শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন যাঁরা আগে শারীরিক অসুস্থতার কারণে সেভাবে ছুটিই নেননি। অথচ মেডিকেল গ্রাউন্ডে বদলির আবেদনে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যে রিপোর্ট তাঁরা জমা দিয়েছেন সেই রিপোর্ট বলছে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বা শিক্ষিকার পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে বাড়ি থেকে দূরে কাজ করার জন্য তাঁরা আনফিট। যদি সত্যিই কেউ আনফিট হয়ে থাকেন তাহলে কীভাবে দীর্ঘদিন অসুস্থ না হয়ে কাজ করলেন তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
সূত্রের খবর, শিক্ষা দপ্তর সম্প্রতি মেডিকেল গ্রাউন্ডে বদলি হওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকাদের একটি তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে। যদিও কেন সেই তালিকা তৈরি হচ্ছে তার কোনও উত্তর দেননি দপ্তরের কোনও আধিকারিক। তবে এখনও পর্যন্ত সেই তালিকায় আলিপুরদুয়ার, মালদা, বর্ধমান, কোচবিহার, নদিয়া সহ আরও বেশ কয়েকটি জেলায় এমন কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকার খোঁজ মিলেছে যাঁরা দীর্ঘদিন চাকরি করলেও যে রোগ দেখিয়ে মেডিকেল গ্রাউন্ডে বদলি নিয়েছেন সেই রোগের কারণে কোনওদিন মেডিকেল লিভ নেননি। অন্যদিকে, একই ল্যাবরেটরি থেকে একাধিক আবেদনকারীর একইরকম রিপোর্টও মিলেছে। এসব দেখেই সন্দেহ দানা বাঁধছে তদন্তকারীদের।
আনফিট শংসাপত্র জোগাড়ে রীতিমতো প্যাকেজ তৈরি করে ফেলেছে বদলি সিন্ডিকেট। নিয়মানুসারে মেডিকেল গ্রাউন্ডে বদলির আবেদন করলে আবেদনকারীর শারীরিক পরীক্ষা করার কথা সরকারি একটি মেডিকেল বোর্ডের। তারপর জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের দপ্তর থেকে সেই সংক্রান্ত শংসাপত্র দেওয়া হয়ে থাকে। বদলি সিন্ডিকেট স্বাস্থ্য দপ্তরেও তাদের জাল বিছিয়ে ফেলেছে। টাকা দিলে তারাই প্রয়োজন অনুসারে শংসাপত্র জোগাড় করে দিচ্ছে।
সূত্রের খবর, এক-একটি রোগের আনফিট শংসাপত্রের জন্য এক এক রকমের প্যাকেজ রয়েছে। স্ত্রী রোগের ক্ষেত্রে ৪০ হাজার, হার্টের অসুখের ক্ষেত্রে ৫৫ হাজার, অন্য জটিল রোগের জন্য গড়ে ৪৫ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। জেলায় জেলায় কারবারিদের সুনির্দিষ্ট কিছু ল্যাবরেটরি রয়েছে যেগুলি থেকে টাকা দিয়ে ভুয়ো মেডিকেল রিপোর্ট তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ। ফলে বদলি কেলেঙ্কারিতে শিক্ষার পাশাপাশি প্রশ্নের মুখে স্বাস্থ্য দপ্তরও।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, বদলি কেলেঙ্কারি পরিচালিত হচ্ছে মূলত এক শ্রেণির অসাধু আধিকারিকদের মাধ্যমেই। কোন রাস্তায় কীভাবে কাজ করলে আইনি জটিলতা এড়িয়ে বদলি করা যাবে দপ্তরের ভেতরের সেইসব ফাঁকফোকর খুঁজে বের করে কিছু আধিকারিকই সিন্ডিকেটের মাথা হয়ে বসেছেন। জেলায় জেলায় এজেন্টদের বসিয়ে রমরমা কারবার চালাচ্ছেন তাঁরা। আর নেতা, মন্ত্রীদের নাম সামনে আসায় আড়ালে চলে গিয়েছে আধিকারিকদের কুকর্ম। নিরপেক্ষ মেডিকেল বোর্ড বসিয়ে মেডিকেল গ্রাউন্ডে যাঁদের বদলি হয়েছে ফের তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। বদলি কেলেঙ্কারিতে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে ইতিমধ্যেই কেউটে বেরিয়ে পড়েছে। এবার কেলেঙ্কারির শেকড় পর্যন্ত তদন্তকারীরা পৌঁছাতে পারেন কি না সেটাই দেখার।




