Special News Special Reports State

অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে ১০১ দিন জেল খাটলেন খবর লাইভের সম্পাদক পীযূষ চক্রবর্তী

5
(1)

খবর লাইভ : পশ্চিমবঙ্গ সাংবাদিকদের কাছে ক্রমেই মরুভূমি হয়ে উঠছে। বিশেষ করে যে সমস্ত সাংবাদিকরা মেরুদণ্ড সোজা রেখে দুর্নীতি এবং বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে খবর করছে তাদের পুলিশ এবং শাসক দল দ্বারা সর্বাত্মকভাবে গলা টিপে মারার চেষ্টা করা হচ্ছে। অতীতে শাসক দলের বিরুদ্ধে খবর করার কারণে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে শফিকুল ইসলাম, মানব গুহ শুদ্ধশীল ঘোষ, সন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়দের। মিথ্যা মামলা আগে দেওয়া হয়েছে খবর লাইভের বর্তমান সম্পাদক তথা তৎকালীন কলকাতা টিভি ও এবিপি গ্রুপের প্রাক্তন সাংবাদিক পীযূষ চক্রবর্তীকে। তারপরেও দুর্নীতি ও বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে ক্রমাগত খবর করে গেছেন পীযূষ। শাসক দল এবং পুলিশ উভয়ের কাছেই তিনি ত্রাস হয়ে উঠেছিলেন। তবে শুধুমাত্র শাসকদলের নয় যে কোনও বেআইনি কাজের বিরুদ্ধেই নিরপেক্ষতা বজায় রেখে যে কোনও রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই তিনি খবর করে গেছেন। সম্প্রতি দুটি মিথ্যা মামলায় তাঁকে ১০১ দিন জেল খাটতে হল। যা নিয়ে তীব্র নিন্দা করেছেন সমাজের বিভিন্ন মহলের লোকজন।

দীর্ঘদিন ধরেই বেআইনি বালি খাদান, কয়লা খাদান, পাথর খাদান, গরু পাচার, সরকারি জায়গা দখল করে বিক্রি করে দেওয়া, পুলিশের তোলাবাজি সহ বিভিন্ন বেআইনি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে খবর করছেন পীযূষ। তার ওপর ২০২৪ সালের মার্চ মাসে পীযূষের গ্রামের বাড়ি হুগলির জাঙ্গিপাড়ার কৃষ্ণপুরে তাঁর ভিটের মাঝখান দিয়ে বেআইনিভাবে রাস্তা করার অনুমতি দিয়ে দেয় পূর্ত দপ্তর। যেটি সম্পূর্ণ বেআইনি। প্রায় ১০০ মিটার লম্বা ও ১০ ফুট চওড়া রাস্তা তাঁদের ভিটের মধ্যে দিয়ে স্থানীয় কিছু দুষ্কৃতীকে নিয়ে জোর করে করতে থাকে ঠিকাদার। পরিবারের লোকজন বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। এমতাবস্থায় পীযূষ কলকাতা হাইকোর্টে একটি মামলা করেন। পাশাপাশি যে দুষ্কৃতীরা জোর করে রাস্তা করছিল তাদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। এরপর মাস দুয়েক পড়ে স্থানীয় কিছু তৃণমূল নেতা মামলা তোলার জন্য পীযূষের পরিবারকে সামাজিক বয়কট করার জন্য চেষ্টা করতে থাকে। তাদের চাষযোগ্য জমিতে যাতে চাষাবাদ না হয় তার জন্য জমিতে জল দিতে বারণ করা হয় ডিপ টিউবওয়েল মালিকদের। ট্রাক্টরের মালিকদেরও বারণ করা হয়। এমনকি শ্রমিকদেরও বারণ করা হয়। পরে অবশ্য চাপে পড়ে সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসে ওই তৃণমূলের নেতারা।

কিন্তু গত ১১ আগস্ট পীযূষ যখন একটি খবরের জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাওড়া যাচ্ছিলেন সেই সময় তাঁকে বেআইনিভাবে রাস্তা তৈরি করার সময় পীযূষের পরিবারকে হুমকি দেওয়া মানিক মুখার্জি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন এবং ইট ছুঁড়তে থাকেন। গোটা ঘটনা সিসিটিভি ক্যামেরার সামনে ঘটে। তারপর পীযূষের আঙ্গুল কামড়ে নেয় ওই দুষ্কৃতী। পীযূষ যা হোক করে ছাড়িয়ে জাঙ্গিপাড়া হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যান। গত বছর মানিকের বিরুদ্ধে রাস্তা নিয়ে হামলার অভিযোগও করা হয় থানায়।
হাসপাতালে চিকিৎসা করাকালীন হঠাৎই সেই সময় জাহাঙ্গীর মণ্ডল, সইদুল, নাজিরের নেতৃত্বে তৃণমূলের জনা কুড়ি দুষ্কৃতী ইমারজেন্সি ভিতরে ঢুকে পীযূষের মোবাইল কেড়ে নেয়। তারপর তাঁকে সেখান থেকে মারতে মারতে হাসপাতালে বাইরে নিয়ে আসা হয়। পরে পুলিশ দিয়ে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে অবশ্য ইমার্জেন্সিতে ক্যামেরার সামনেই জাঙ্গিপাড়া থানার মেজবাবু পীযূষের মেডিকেল সার্টিফিকেট কেড়ে নেন। কারণ ওই মেডিকেল সার্টিফিকেটে ইনজুরি রিপোর্ট উল্লেখ করা ছিল। এরপর তাকে থানায় নিয়ে এসে চন্ডীতলা থানার সিআই ও জাঙ্গিপাড়া থানার ওসি ভুলভাল প্রশ্ন করতে থাকেন। কেন তিনি পুলিশ এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে খবর করছেন? অবিলম্বে সেই খবর বন্ধ করার কথাও বলেন। সিআই সন্দীপ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন তিনি সিআইডিতে কাজ করেছেন ফলে কিভাবে মানুষকে শায়েস্তা করতে হয় তিনি জানেন। এরপর পীযূষ সিআইডির একের পর এক অফিসারের নাম বলতে থাকেন এবং বলেন এঁদের যদি জিজ্ঞাসা করেন তবে পীযূষের সম্পর্কে তারা বলে দেবেন। কারণ ক্রিমিনাল বিটের সাংবাদিক হিসেবে পীযূষ ১৬ বছর ধরে কর্মরত। পরে অবশ্য তাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়। অন্যদিকে তাকে যারা মারধর করল তাদের বিরুদ্ধে জামিনযোগ্য ধারা দেওয়া হয়। অভিযুক্ত আদালতে তোলা হলে ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন বিচারক। ১৯ আগস্ট যেদিন কেস ডায়েরি জমা দেওয়ার কথা সেদিনই তার জামিন মঞ্জুর করে আদালত।
যেদিন তিনি ছাড়া পাবেন সেদিন হঠাৎই জানতে পারেন এক বছর চার মাস আগে হরিপাল থানারএকটি মামলায় তাকে সুন অ্যারেস্ট করা হয়েছে। যে মামলাটি সম্পর্কে পীযূষকে কোনদিন নোটিশও পাঠায়নি পুলিশ। ওই মামলায় তাকে ৯২ দিন চন্দননগর জেলে বন্দি থাকতে হয়।

হরিপাল থানার মামলাটি কী, কে করেছেন তার কিছুই জানেন না খবর লাইভের সম্পাদক। পরে তিনি জানতে পারেন চাকরি দেওয়ার নাম করে বর্ধমান জেলার দুই ভাই এক ব্যক্তির কাছ থেকে বেশ কয়েক লক্ষ টাকা নিয়েছেন। তাদের এজেন্ট হিসেবে নাকি কাজ করতেন পীযূষ চক্রবর্তী। প্রশ্ন, যদি এজেন্ট হিসেবে কাজ কেউ করে থাকেন তাহলে তার সঙ্গে অভিযুক্তদের নিশ্চয় যোগাযোগ থাকবে। টাকার লেনদেন থাকবে। বা অভিযোগকারী সঙ্গে যোগাযোগ থাকবে। এর কোনোটিই অবশ্য পুলিশের পক্ষে দেখানো সম্ভব নয়। কারণ কোন রকম যোগাযোগই তাদের সঙ্গে ছিল না সাংবাদিক পীযূষের।

তবে মিথ্যে মামলা করার পিছনে দুটো কারণ স্পষ্ট। এক, খবর লাইভ লাগাতার দুর্নীতি ও বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে খবর করে গিয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাস্তা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করার প্রেক্ষিতে আদালত যেদিন বিভিন্ন দপ্তরকে নোটিশ পাঠায় তার দুদিন পরই অবশ্য হরিপাল থানায় পীযূষের নামে মিথ্যে অভিযোগটি দায়ের হয়। এক বছর চার মাস আগে মামলা হলেও পুলিশ একবারের জন্যেও পীযূষকে নোটিশ পাঠানোর প্রয়োজন মনে করেনি। অথচ ওই এক বছর চার মাস সময়ে তিনজন ওসি বদলি হয়েছে ওই থানায়। প্রত্যেকের আমলেই হয় বেআইনি চোলাই মদ, বিআইনি সাট্টার কারবার বা পুকুর ভরাট বা বিভিন্ন গাড়ি থেকে পুলিশের অবৈধভাবে টাকা তোলার খবর হয়েছে। ওসিদের সঙ্গে নিয়মিত কথা হলেও তারা জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি। ইচ্ছাকৃতভাবেই পীযূষকে ফাঁসানোর জন্য এফআইআরে তার নাম রাখা হয়েছে। অভিযোগকারী বা অভিযুক্ত তাদের কারও সঙ্গেই কোনো যোগাযোগ দেখাতে যেমন পুলিশ পারবে না তেমন কোন টাকার লেনদেনেরও প্রমাণ দেখাতে পারবে না। ওই থানা এলাকার বিরুদ্ধে যাতে খবর না হয় সেই কারণেই তাকে চাপে রাখার জন্য এই মিথ্যা মামলার তদন্ত না করে পুলিশ পীযূষকে গ্রেফতার করেছে। পাশাপাশি তদন্তকারী অফিসারের ভূমিকা যথেষ্ট বিরক্তিকর। তিনি এমন কিছু কাজ করেছেন যার প্রমাণ পীযূষের কাছে রয়েছে। রাজ্য পুলিশের তদন্তের উপর কোন ভরসায় নেই পীযূষ ও তার পরিবারের। যেহেতু আইএস তথা প্রাক্তন মুখ্য সচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ব্যবহার করে নাকি অপরাধ করেছে অপরাধীরা সেই কারণে পীযূষ চান সিবিআই তদন্ত। এভাবে প্রতিবাদী সাংবাদিককে থামানো যায়নি এবং আগামী দিন যাবেও না।

মিথ্যা মামলায় পীযূষকে জেল খাটানোয় সব মহল থেকেই নিন্দার ঝড় উঠেছে। সিপিএম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য, রবীন দেব, সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়, কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী, বিজেপি নেতা সজল ঘোষ, শুভেন্দু অধিকারী সকলেই নিন্দা করেছেন। তাঁরা আইন দিক থেকে পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছেন।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

As you found this post useful...

Follow us on social media!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *