Special News Special Reports State

চলে গেলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা সিপিআইএম নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য

0
(0)

খবর লাইভ : চলে গেলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা সিপিআইএম নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। বৃহস্পতিবার সকাল ৮.২০ নাগাদ বাড়িতেই প্রয়াত হন তিনি। বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। দীর্ঘদিন ধরেই শয্যাশায়ী। ফুসফুসে সংক্রমণের কারণে এমন পরিস্থিতি। তবে এদিন কোনওভাবেই আর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে। রইলেন তাঁর স্ত্রী মীরা ভট্টাচার্য ও সন্তান সুচেতন ভট্টাচার্য।

২০০০ থেকে ২০১১ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বিখ্যাত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভ্রাতষ্পুত্র। এর আগে এক বছর তিনি উপ মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

আরও পড়ুনঃ স্বপ্নভঙ্গের জের, বৃহস্পতিবার ভোরে অবসর ঘোষণা বিনেশ ফোগতের

১৯৪৪ সালে উত্তর কলকাতার ভট্টাচার্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ১৯৬১ সালে কলকাতার শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয় থেকে পাশ করেন। তৎকালীন প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে ১৯৬৪ সালে সাম্মানিক স্নাতক হন। স্কুলজীবন থেকেই তিনি এনসিসি-তে যোগদান করেন। কলেজ জীবনেও তিনি এনসিসি-র ক্যাডেট ছিলেন।

কলেজ জীবনেই রাজনীতিতে যোগদান বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের। রাজ্যের উত্তাল খাদ্য আন্দোলনের সময় থেকে শুরু করে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভাবে যোগদান করেন তিনি। গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের রাজ্য সম্পাদক হন। সেটাই পরবর্তীতে ভারতীয় গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন ডিওয়াইএফআই-এর চেহারা নেয়।

১৯৭৭ সালে তিনি কাশীপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তবে পরের বার ১৯৮২ সালে কংগ্রেসের প্রফুল্লকান্তি ঘোষের কাছে ৭৮২ ভোট পরাজিত হন। ১৯৮৭ সালে নির্বাচনী কেন্দ্র পরিবর্তন করে যাদবপুরে থেকে ভোটে লড়েন। সেই কেন্দ্র থেকেই টানা ৫ বার জয়ী হন। তবে, পরিবর্তনের ঝড়ে ২০১১ বিধানসভা নির্বাচনে যাদবপুরে কেন্দ্র থেকেই তৃণমূল প্রার্থী মণীশ গুপ্তের কাছে পরাজিত হন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী। সিপিআইএম-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদকমণ্ডলির সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং পলিটব্যুরোর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কমরেড ভট্টাচার্য।

মন্ত্রিত্ব:
১৯৭৭-৮২: পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মন্ত্রিসভায় তথ্য ও জনসংযোগ দফতরের মন্ত্রী। পরে এই দফতরের নাম বদল থেকে হয় তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর।
১৯৮৭-৯৬ : তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের পাশাপাশি পুর ও নগরোন্নয়ন বিভাগের দায়িত্ব নেন।
১৯৯১-৯৩ : তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, পুর ও নগর উন্নয়ন বিভাগ
১৯৯৪ : তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ
১৯৯৬ : স্বরাষ্ট্র বিভাগ, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, তথ্য প্রযুক্তি বিভাগ
১৯৯৯ : উপ-মুখ্যমন্ত্রী
নভেম্বর ৬, ২০০০ : পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন
মে ১৮, ২০০১ : ত্রয়োদশ বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন
মে ১৮, ২০০৬ : চতুর্দশ বিধানসভা সাধারণ নির্বাচনেও মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন
মে ১৯, ২০১১ : পঞ্চদশ বিধানসভা সাধারণ নির্বাচনে পরাজিত হয়ে মুখ্যমন্ত্রী থেকে পদত্যাগ করেন।

পশ্চিমবঙ্গের ভিত্তি কৃষি। বুদ্ধদেব তাঁর আমলে শিল্পায়নের অভিযান শুরু করেন। কিন্তু তাঁর সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণ ও নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে তুমুল আলোড়ন হয়। তবে, শুধু সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামই নয়, ২০০৬-এর জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট সল্টলেকের জমি বরাদ্দের বিষয়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং অন্যান্য সহ বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রীদের নোটিশ জারি করে।

পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপের জন্য বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকার প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ে। তিনি শুধু বিরোধী দলগুলিই নয়, অন্যান্য বামফ্রন্ট জোট শরিকরাও এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে।

২০০৭-এর ১৫ মার্চ নন্দীগ্রামে পুলিশকে আটকাতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বিপুল সমালোচিত হন। নন্দীগ্রামে গুলি চালোনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। তবে, সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নন্দীগ্রামে আইনের শাসন ছিল না। শাতাধিক গ্রামবাসী নন্দীগ্রাম ছেড়ে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নেন। রাস্তা খোঁড়া হয়েছিল। গ্রামে ঢুকতে দেওয়া হয়নি পুলিশকে।

রাজনৈতিক বিরোধীদের আক্রমণের শিকার হন বুদ্ধবাবু। ডান এবং অতি-বামপন্থীদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য প্রবল সমালোচিত হন। এর জেরেই সপ্তম বামফ্রন্ট সরকারের অবসান হয়। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে, ২০০১ ও ২০০৬ সালে সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টকে পরপর দুটি নির্বাচনে নেতৃত্ব দেন। ২০০৬-এ ২৯৪-এর মধ্যে ২৩৫ আসনে জেতে বামফ্রন্ট। যে ভোটে তারা ভালো ফল করতে পারবে কি না তা নিয়ে সংশয় ছিল, সেই ভোটে ২৩৫ আসন পেয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেন কমরেডরা। তাঁদের মত ছিল, লোকসভা ভোটে ৪২টির মধ্যে ৩৫ আসন পেয়েছে বামফ্রন্ট। বিধানসভা ভোটে ২৩৫। বুদ্ধবাবু বুক ফুলিয়ে বলতেন, “আমরা ২৩৫, ওরা ৩০। কে আমাদের ঠেকাবে।“ কিন্তু সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের সিদ্ধান্তে নিজের দলেই খুব একটা সমর্থন পাননি তিনি। আর ২০১১-তেই পরাজয় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের। ভরাডুবি বামেদের। অবস্থা এমন যে ২৩৫ পাওয়া সেই বিধানসভায় একটি আসনও নেই বামেদের। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে বামেরা শূন্য।

অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক জীবন থেকে সন্ন্যাস। কার্যত ঘরবন্দি ছিলেন বুদ্ধবাবু। শেষ কবার ভোট দিতেও যেতে পারেননি তিনি। তবে, বিভিন্ন সময় তিনি সমসাময়িক পরিস্থিতির উপর লিখিত প্রতিক্রিয়া দিতেন তিনি।

রাজনীতির পাশাপাশি ছিল বুদ্ধবাবু জড়িত ছিলেন সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গেও। বই লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন। আবৃত্তি করতেন সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাইপো। বাম আমলে রাজ্যের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের তিনিই ছিলেন হোতা।
তাঁর লেখা বইগুলি হল-
• চিলিতে গোপনে, গ্যাব্রিয়াল গারসিয়া মারকোয়েজ (অনুবাদ)
• দুটি নাটক
• চেনা ফুলের গন্ধ
• তিন মায়ের কথা
• রচনা প্রবাহ
• স্বর্গের নীচে মহা বিশৃঙ্খলা
• ফিরে দেখা প্রথম ও দ্বিতীয়
• নাৎসি জার্মানির জন্ম ও মৃত্যু

২০০২২ জানুয়ারি ভারত সরকারের তরফে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার পদ্মভূষণ দেওয়া হয়। তবে তিনি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন।

অনেকবারই অসুস্থ হয়ে সংকটজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে। সব রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সরিয়ে রেখে তাঁকে দেখতে গিয়েছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দিয়েছেন সব রকম সাহায্যের আশ্বাস।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

As you found this post useful...

Follow us on social media!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *