International Special News Special Reports

ইরান জুড়ে রক্তবন্যা, হাসপাতালে লাশের স্তূপ

0
(0)

খবর লাইভ : ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে তাজা গুলি ছুঁড়ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও সেনারা। এতে বিক্ষোভকারীরা পিছু না হটে বরং নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন স্থানে একের পর এক সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনায় এত মানুষ হতাহত হয়েছে, অনেক হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। মর্গগুলো লাশে ভরে গেছে।

আজ সোমবার পর্যন্ত ৩০৩ জন প্রতিবাদকারী প্রাণ হারিয়েছে। আর বিক্ষোভকারীদের হাতে এ পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর ১৩৮ জন সদস্য মারা গেছেন। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমের খবরে এই দাবি করা হয়েছে।

এদিকে গতকাল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার গোষ্ঠী এইচআরএএনএর উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, ইরানে দুই সপ্তাহের বিক্ষোভে ৬০০ জনের বেশি নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে বিক্ষোভকারী ৪৯০ জন এবং ৪৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। এ ছাড়া ১০ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ইরানি সংসদের স্পিকার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইরানে মার্কিন সামরিক বাহিনী হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত হানবে তেহরান। ইরানে বিক্ষোভকে দেশটির জনগণের ‌‌‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে অভিহিত করে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ইজরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার।

দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ এই দেশে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া গত দুই সপ্তাহের সরকার বিরোধী বিক্ষোভে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ২০৩ জন নিহত হয়েছে। এ ছাড়া চলমান এই সংঘাতে আহত হয়েছে হাজার হাজার মানুষ।

আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়, আহদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকসহ হাসপাতালগুলোর কর্মীদের। অন্যদিকে নিহতের স্বজনদের আর্তনাদে ভারী হয়ে গেছে আকাশ-বাতাস। ইরানের তিনটি হাসপাতালের চিকিৎসকরা সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সঙ্গে কথা বলেছেন।

তাঁরা জানিয়েছেন, তাঁদের হাসপাতালগুলো সংঘাত-সহিংসতায় আহত ও নিহতদের ভিড় সামলাতে সমস্যায় পড়ছে। হতাহতদের বেশির ভাগের শরীরে গুলির ক্ষত রয়েছে বলে জানান চিকিৎসকরা। তেহরানের একটি হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, ‘অনেক তরুণের মাথায় এবং বুকে সরাসরি গুলি লেগেছে।’ তেহরানের আরেকটি হাসপাতালের কর্মীরা জানিয়েছেন, শরীরে গুলি এবং রাবার বুলেটের ক্ষত নিয়ে আসা বহু মানুষকে চিকিৎসা দিয়েছেন তাঁরা। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনো অবস্থাতেই সরকার পিছু হটবে না। সব মিলিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তা ও রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশটি।

সোমবার সকালে কয়েক শ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের জাতীয় পুলিশ। ইরান হিউম্যান রাইটস বলেছে, কয়েক দিন ধরে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তথ্য যাচাই ব্যাহত হচ্ছে। ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবি বলেছে, জাতীয় গণমাধ্যমের সঙ্গে এক কথোপকথনে প্রেসিডেন্ট ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কারে সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেছেন এবং শিগগিরই সমস্যার সমাধান করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

এই আন্দোলন-বিক্ষোভের প্রধান কারণ অর্থনীতি। বছরের পর বছর ধরে অবমূল্যায়নের জেরে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়েল বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রা। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়েলের মান ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫। অর্থাৎ ইরানে এখন এক ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫ ইরানি রিয়েল। জাতীয় মুদ্রার এই দুরবস্থার ফলে দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি চলছে ইরানে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে ইরানের সাধারণ জনগণ। এই পরিস্থিতিতে গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। সেই ধর্মঘট থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত। এরপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সব শহর-গ্রামে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ এবং দিনকে দিন বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়তে থাকে। বর্তমানে পুরো দেশকে কার্যত অচল করে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা।

রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব শহরে মোতায়েন করা হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের। দেশের ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে সরকার এবং গত শনিবার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও সেনাবাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রিপাবলিক গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) নামানো হয়েছে। এদিকে পশ্চিমি সংবাদমাধ্যমগুলোর সূত্রে জানা গেছে, ইরানের বিক্ষোভকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের বিক্ষুব্ধ জনতাকে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও ঘোষণা করেছেন তিনি।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

As you found this post useful...

Follow us on social media!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *