কসবায় গণধর্ষণের প্রতিবাদে এবং নিরাপত্তার দাবিতে  বিক্ষোভ বর্তমান ও প্রাক্তনীদের, আপাতত বন্ধ আইন কলেজ

খবর লাইভ : কসবার সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজে ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় উত্তাল গোটা রাজ্য। ঘটনার প্রতিবাদে সোমবার সকাল থেকেই কলেজের বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের বিক্ষোভে কেঁপে উঠল এলাকা। কলেজ আপাতত অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যেই এই মর্মে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে।

ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। পাশাপাশি, কলেজ চত্বরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করারও আহ্বান জানান তারা। বৃষ্টিভেজা সোমবার সকালেও থামেনি প্রতিবাদের স্রোত। ছাত্রছাত্রীরা উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেন, কিন্তু তার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা উপাচার্যকে উদ্দেশ্য করে একটি লিখিত ডেপুটেশন প্রস্তুত রেখেছেন।

কলেজের মূল ফটকের বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক পুলিশ, উপস্থিত রয়েছেন মহিলা পুলিশ কর্মীরাও। কলেজের ইউনিয়ন রুম ও নিরাপত্তারক্ষীদের ঘরের দিকে কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।

এই ঘটনার প্রতিবাদে শুধু সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজ নয়, শহরের প্রায় ১০ থেকে ১২টি আইন কলেজের ছাত্রছাত্রী এবং প্রাক্তনীরাও যোগ দিয়েছেন বিক্ষোভে। কসবা থানা থেকে কলেজ পর্যন্ত প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিল করেন তারা। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অনেকেই বর্তমানে পেশায় আইনজীবী। তাদের বক্তব্য, “আমরাই ভবিষ্যতে আইনের পথে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াব, আর আজ আমাদেরই সহপাঠিনী এমন নির্মমতার শিকার! এই ঘটনায় প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না হলে ন্যায় বিচার নিয়ে বিশ্বাস কোথায় থাকবে?”

সামগ্রিক পরিস্থিতির দিকে কড়া নজর রাখছে পুলিশ প্রশাসন। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, নির্যাতনের শিকার ছাত্রীর জন্য ন্যায় এবং ক্যাম্পাসে সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা ধর্ষণের ঘটনায় মূল অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। দাবি, অতীতেও একাধিক মহিলার সঙ্গে মূল অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা মনোজিৎ মিশ্র দুর্ব্যবহার করেছেন। কলেজের পিকনিকে গিয়ে মেয়েদের সঙ্গে অভব্য আচরণ করেছেন। তৃণমূলের ছাত্র পরিষদের সেক্রেটারি পদের লোভ দেখিয়ে অনেক মেয়েকেই ‘টোপ’ দিতেন অভিযুক্ত। এ ক্ষেত্রেও সেটাই করেছিলেন। অভিযোগ, প্রথম এবং দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রীদেরই ‘টার্গেট’ করা হত।

কসবা কাণ্ডের নির্যাতিতা জানিয়েছেন, গত ২৫ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ১০টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত কলেজ ক্যাম্পাসের মধ্যে ধর্ষণ করা হয়েছে তাকে। পড়ুয়াদের দাবি, নানা কারণে কলেজের ক্লাসের নির্ধারিত সময়ের পরেও তাদের কলেজে থেকে যেতে হয়। সে ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন অনেকেই। অভিযোগ, ক্যাম্পাসের ভিতরে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা নেই। নিরাপত্তারক্ষীর ভূমিকাও সন্তোষজনক নয়। অভিযোগ, কলেজে যে কেউ ঢুকে পড়েন। রক্ষী পরিচয়পত্র দেখেন না অনেক ক্ষেত্রেই। কলেজ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে প্রথম থেকেই উদাসীন বলে দাবি করেছেন ছাত্রছাত্রীদের একাংশ।

ক্যাম্পাস থেকেই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন বিক্ষোভকারীরা। বর্তমান পড়ুয়া দেবদ্যুতি সেনগুপ্ত বলেন, ‘‘প্রথম বর্ষ থেকে পঞ্চম বর্ষ পর্যন্ত আমরা সকলেই এখানে জড়ো হয়েছি। কলেজে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। কর্তৃপক্ষের কাছে তাই ডেপুটেশন জমা দিতে চাই। কিন্তু উপাচার্য জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আসতে পারবেন না।’’ ওই কলেজের চতুর্থ বর্ষের আর এক ছাত্রী জোয়া আলম বলেন, ‘‘আমাদের কলেজের নিরাপত্তারক্ষী কারও কার্ড দেখেন না। দীর্ঘ দিন কলেজে সেমিনার হয়নি।’’ রোকেয়া দাশগুপ্তের কথায়, ‘‘আমরা চাই, এই কলেজের নিরাপত্তা জোরদার হোক, পড়াশোনা ঠিকমতো চলুক। কারণ, কলেজটা পড়াশোনা করারই জায়গা। আমরা সেটাই করতে এসেছি।’’

একাধিক ছাত্রী অভিযোগ করেছেন, কলেজ পিকনিক বা অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে অভিযুক্তের আচরণ ছিল মারাত্মক অভব্য। ঘটনাটি ঘটে ২৫ জুন। কলেজ ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন ছাত্রছাত্রীরা। তাঁদের অভিযোগ, কলেজের নির্ধারিত ক্লাসের সময়ের বাইরেও নানা কারণে ক্যাম্পাসে থাকতে হয়, কিন্তু সেই সময় নিরাপত্তা একেবারেই অপ্রতুল।

ছাত্রছাত্রীদের দাবি, অভিযুক্তকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে এবং একইসঙ্গে কলেজ প্রশাসনকে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে হবে।

ইতিমধ্যেই গণধর্ষণের ঘটনায় চার জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে রয়েছেন মূল অভিযুক্ত, যিনি প্রাক্তনী এবং ওই কলেজেরই অস্থায়ী কর্মী। তৃণমূল ছাত্র পরিষদের নেতা ওই অভিযুক্ত। এ ছাড়া, নির্যাতিতা লিখিত ভাবে আরও যে দু’জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছিলেন, তারাও পুলিশি হেফাজতে। ঘটনার দিন দায়িত্বে থাকা কলেজের রক্ষীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যে ন’জন সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করেছে কলকাতা পুলিশ। নেতৃত্বে রয়েছেন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার (দক্ষিণ শহরতলি) প্রদীপকুমার ঘোষাল। ঘটনাস্থলে গিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ করছেন তারা। সংগ্রহ করা হয়েছে সাড়ে সাত ঘণ্টার সিসিটিভি ফুটেজ। কসবার ঘটনা খতিয়ে দেখতে শহরে চার সদস্যের তথ্যানুসন্ধানী দল পাঠিয়েছে বিজেপি। সোমবার বিকেলে তাদের ওই কলেজে যাওয়ার কথা। কিন্তু পুলিশের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি মেলেনি।

News Desk

Recent Posts

মেঘালয়ের বেআইনি কয়লা খনিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, কমপক্ষে ১৮ শ্রমিকের মৃত্যু

খবর লাইভ : মেঘালয়ের বেআইনি কয়লা খনিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, কমপক্ষে ১৮ শ্রমিকের মৃত্যুখবর লাইভ :…

2 months ago

গভীর রাতে ভূকম্পনে কেঁপে উঠল উত্তরবঙ্গ

খবর লাইভ : গভীর রাতে ভূকম্পনে কেঁপে উঠল উত্তরবঙ্গ। দার্জিলিং, শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়িতে প্রবল কম্পনে…

2 months ago

সুপ্রিম কোর্টে রাজ্যের গালে চড়, ৩১শে মার্চের মধ্যে বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ দিতেই হবে

খবর লাইভ : রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য বড়সড় স্বস্তির খবর। প্রায় এক দশক ধরে চলা…

2 months ago

রাজ্যের আবেদন খারিজ করল কমিশন, এসআইআর-র কাজে ভিন রাজ্যে যেতেই হচ্ছে স্বরাষ্ট্রসচিব-সহ দুই সিপি-কে

খবর লাইভ : পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুরোধ উপেক্ষা করে জাতীয় নির্বাচন কমিশন এসআইআর-এর কাজের জন্য রাজ্যের…

3 months ago

রাস্তা সংস্কারের কাজে নিজেই হাত মেলালেন গাজোলের বিজেপি বিধায়ক চিন্ময় দেব বর্মন

খবর লাইভ : পরনে ধুতি, মাথায় ইট ভর্তি ডালি নিয়ে এলাকার মানুষের সঙ্গে রাস্তা সংস্কারের…

3 months ago

সুপ্রিম কোর্টে ফের পিছল আইপ্যাক মামলার শুনানি,শুধুমাত্র দলের নথি নিয়েছিলাম: জানালেন মমতা

খবর লাইভ : সুপ্রিম কোর্টে পিছিয়ে গেল আইপ্যাক সংক্রান্ত মামলার শুনানি। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডির…

3 months ago